মঙ্গলবার, 25 আগস্ট 2026
⚠ ব্রেকিং
অপরাধ 🇧🇩 বাংলা

রংপুরে শিক্ষক পরিবারের চার সদস্য হত্যা: ইয়াবা সেবন থেকে নৃশংসতার বিস্তারিত

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ইয়াবা সেবনরত অবস্থায় ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে প্রতিবেশী দুই যুবক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। গ্রেপ্তারকৃতরা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে, যা পুরো ঘটনার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।

শেয়ার করুন:
রংপুরে শিক্ষক পরিবারের চার সদস্য হত্যা: ইয়াবা সেবন থেকে নৃশংসতার বিস্তারিত

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল, তার পেছনে বেরিয়ে এসেছে এক লোমহর্ষক ও নৃশংস চিত্র। প্রাথমিক তদন্ত এবং গ্রেপ্তারকৃতদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অনুযায়ী, মাদক সেবনরত অবস্থায় ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থেকেই এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যাই করেনি, বরং সমাজের গভীরে মাদকের ভয়াবহ প্রভাবকেও আবারও স্পষ্ট করে তুলেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, মধ্যরাতে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামের দুই প্রতিবেশী যুবক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে প্রবেশ করে। সিদ্ধার্থের মাসখানেক ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার ইয়াবা সেবনের অভ্যাস ছিল এবং ঘটনার রাতে মুগ্ধকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমে প্রতিবেশী সীমান্তের বাড়িতে ইয়াবা সেবন করে। এরপর আরও ইয়াবা সেবনের আকাঙ্ক্ষায় তারা শান্ত নামের এক মাদক কারবারির কাছ থেকে আরও কয়েক পিস ইয়াবা সংগ্রহ করে। এরপর দেবুদের নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির সিঁড়ি ও ছাদ ব্যবহার করে তারা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করে।

গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আট পিস ইয়াবা সেবন করে। এর আগে সিদ্ধার্থ দু-একবার ওই ছাদে ইয়াবা সেবন করলেও মুগ্ধর জন্য সেটি ছিল প্রথমবার। ইয়াবা সেবন করতে করতে ভোরের আলো ফোটার সময় হয়ে আসে। ঠিক সেই মুহূর্তে ছাদে ওঠেন গণপতি চক্রবর্তী। ছাদে দুজন অপরিচিত যুবককে দেখে তিনি স্বাভাবিকভাবেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। নিজের সম্মানহানি ও মাদক সেবনের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ গণপতি চক্রবর্তীর ঘাড়ে থাকা গামছা দিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এই সময় গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে তাদের ধস্তাধস্তিও হয়।

গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যার পর তার মরদেহ ছাদের এক কোণায় রেখে টিন দিয়ে ঢেকে দেয় হত্যাকারীরা। টিনের শব্দ পেয়ে বা অন্য কোনোভাবে ছাদে চলে আসেন গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাদের মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী। ছাদে উঠে তারা যখন এই ভয়াবহ দৃশ্য এবং হত্যাকারীদের পরিচয় উপলব্ধি করেন, তখন মুগ্ধ সেই একই গামছা দিয়ে প্রীতিলতা চক্রবর্তীর গলা পেঁচিয়ে ধরেন এবং সিদ্ধার্থ আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর গলা ও মুখ চেপে ধরেন। মা ও মেয়ে উভয়কেই শ্বাসরোধ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পাশের ছাদ থেকে যাতে মরদেহ দেখা না যায়, সেজন্য মা ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়ির কাছাকাছি এনে রাখা হয়।

ছাদের হত্যাকাণ্ড শেষ করে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নিচে নেমে আসে। নিচে এসে তারা গণপতি চক্রবর্তীর ছোট ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকে বিছানায় বসে থাকতে দেখেন। প্রিয়ম সিদ্ধার্থকে চিনতে পারায় তাকেও হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় দুই ঘাতক। সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দুজনেই প্রিয়মকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য এবং ডাকাতির ঘটনা সাজাতে সিদ্ধার্থ নিচতলায় নেমে বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে।

চারজনকে হত্যা এবং এসব কাজ করতে করতে হত্যাকারীরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এরপর তারা সেখানেই গোসল করে এবং আরও এক পিস ইয়াবা সেবন করে। এমনকি তারা খেজুর ও শসাও খায়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তারা ডাকাতির ঘটনা সাজানোর চেষ্টা করে। ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে দেয় এবং বাড়ি থেকে কিছু সোনা ও পনেরো হাজার টাকা নিয়ে যায়। জুমার নামাজের সময় তারা ছাদ দিয়ে বেরিয়ে যায়। ১৫ হাজার টাকা নিয়েছিল মুগ্ধ।

ঘটনার পরদিন সন্ধ্যায় সিদ্ধার্থ প্রতিবেশী পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পাশে ওই সোনা মাটিতে পুঁতে রাখে, যা পূর্ণিমা জানতেন না। পেশায় স্বর্ণ কারিগর সিদ্ধার্থ দাস ওই সোনা বের করে আগুন ধরিয়ে তা পরীক্ষা করেও দেখেছিল। এসবের আলামত হিসেবে খেজুরের বিচি, আগুনে পোড়ানো চুরি, ইয়াবা সেবনের উপকরণ ইত্যাদি জব্দ করা হয়েছে বলে তদন্তকারী কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

পুলিশি তদন্তে দ্রুতই হত্যাকারীদের চিহ্নিত করা হয়। সিদ্ধার্থের শরীরে আঁচড়ের চিহ্ন থাকায় এবং স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে তাকে আটক করা হয়। ঘটনার পর সিদ্ধার্থ একটি ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসাও নিয়েছিল। পুলিশি উপস্থিতি টের পেয়ে মুগ্ধ দাস পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ধাওয়া করে তুতফার্ম এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। রোববার, ২৩ আগস্ট, ভোরে দুজনকে আটক করার পর ওইদিন রাতে তারা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়, যেখানে তারা পুরো হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেয়। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ