বাগেরহাটের ফকিরহাটে এক যুগ আগে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর শিশু সাজ্জাত হোসেন হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে এই হত্যাকাণ্ডের দায়ে মোসা. রিকু বেগমকে (৬০) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। একই সাথে তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে বাগেরহাট অতিরিক্ত দায়রা জজ ২য় আদালত-এর বিচারক ফাইজুর রহমান এই গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করেন। তবে রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রিকু বেগম আদালতে উপস্থিত ছিলেন না; তিনি জামিনে মুক্ত হওয়ার পর থেকেই পলাতক রয়েছেন, যা বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত মোসা. রিকু বেগম ফকিরহাট উপজেলার মূলঘর গ্রামের মো. বাবর আলী শেখের স্ত্রী। এই রায়ের মাধ্যমে একটি মর্মান্তিক ঘটনার বিচারিক সমাপ্তি ঘটলেও, আসামির পলাতক থাকা রায় কার্যকরীকরণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এখন পলাতক আসামিকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছে। এই ঘটনা সমাজে অপরাধ দমনের পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ফকিরহাট উপজেলার মূলঘর গ্রামের মাসুদ শেখের ৫ বছর বয়সী ছেলে সাজ্জাত হোসেন আকস্মিকভাবে নিখোঁজ হয়। শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার খবর দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিবারের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। আশেপাশের এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি চালানো হলেও প্রাথমিকভাবে সাজ্জাতের কোনো সন্ধান মেলেনি, যা পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়ায়।
নিখোঁজ হওয়ার পরদিন, অর্থাৎ ১১ ফেব্রুয়ারি, স্থানীয় শামীম নামের এক ব্যক্তির ঘেরের পাশে পরিত্যক্ত কচুরিপানার স্তূপ থেকে সাজ্জাতের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি এলাকায় শোকের ছায়া নামিয়ে আনে এবং জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি সাজ্জাতের বাবা মাসুদ শেখ রিকু বেগমকে একমাত্র আসামি করে ফকিরহাট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে তিনি সুস্পষ্টভাবে অভিযোগ করেন যে, রিকু বেগম তার নিষ্পাপ পুত্রকে গলা টিপে হত্যা করেছেন, যা তদন্তে আরও গভীরতা যোগ করে।
মামলার তদন্ত শুরু হলে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং পারিপার্শ্বিক প্রমাণ সংগ্রহ করে। মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়, যা হত্যাকাণ্ডের কারণ ও প্রকৃতি নির্ধারণে সহায়ক হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলে। আদালত বিভিন্ন সাক্ষী ও প্রমাণাদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেন এবং উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি শোনেন। এই দীর্ঘসূত্রিতা মামলার গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতাকেই নির্দেশ করে।
দীর্ঘ সাক্ষ্য প্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালত এই রায় ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. আলতাফ হোসেন আদালতের এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, শিশু সাজ্জাত হোসেনকে হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আসামি বর্তমানে পলাতক থাকায় তাকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে এবং এ বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
অন্যদিকে, আসামি পক্ষের আইনজীবী মো. ফয়সাল আরেফিন এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। এই রায় সমাজে শিশু হত্যা প্রতিরোধে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে অনেকে মনে করছেন, যদিও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির পলাতক থাকা বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা সৃষ্টি করেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এখন পলাতক আসামি রিকু বেগমকে দ্রুত খুঁজে বের করে আদালতের রায় কার্যকর করার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত জরুরি।