অভিজাত সামাজিক প্রতিষ্ঠান ঢাকা ক্লাবের সভাপতিসহ শীর্ষ চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মচারীর পাওনা টাকা পরিশোধ না করে আত্মসাৎ এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট, ২০২৬) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর রহমানের আদালতে এই মামলাটি করেন ঢাকা ক্লাবের সাবেক কর্মচারী আশিক মোল্লা। বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে চার আসামিকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, যা দেশের অন্যতম সুপরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী এই ক্লাবের ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ভুক্তভোগী আশিক মোল্লা ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর ঢাকা ক্লাবে অ্যাটেন্ডেন্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এক বছর পর, অর্থাৎ ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট তাকে স্থায়ী কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পর, চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি তাকে আকস্মিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে, প্রায় ছয় মাস ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকার পর গত ২৭ জুলাই তাকে সম্পূর্ণভাবে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, যা তার কর্মজীবনের একটি অপ্রত্যাশিত ইতি টানে।
চাকরি থেকে অব্যাহতির পর আশিক মোল্লা দাবি করেন যে, তার সার্ভিস বেনিফিট, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, নোটিশ পে এবং বকেয়া বেতন বাবদ মোট ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে ঢাকা ক্লাবের কাছে। এই বিশাল অঙ্কের পাওনা আদায়ে তিনি প্রথমে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শকের কার্যালয়ে বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১২৪(ক)-এর (৫) ধারায় মধ্যস্থতার জন্য আবেদন করেন। এটি শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তির একটি সাধারণ পদ্ধতি, যা কর্মক্ষেত্রে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে ব্যবহৃত হয়।
তবে, মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া সত্ত্বেও ঢাকা ক্লাবের অভিযুক্ত কর্মকর্তারা মধ্যস্থতার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান। তাদের এই অসহযোগিতামূলক আচরণের কারণে মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ফলস্বরূপ, আশিক মোল্লা শ্রম পরিদর্শকের কাছ থেকে তার পাওনা আদায়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য একটি লিখিত ছাড়পত্র সংগ্রহ করেন, যা তাকে আদালতে যাওয়ার পথ খুলে দেয় এবং তার দাবির সত্যতা প্রমাণের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ছাড়পত্র পাওয়ার পর, গত ১৫ আগস্ট আশিক মোল্লা তার পাওনা টাকা চাইতে সরাসরি ঢাকা ক্লাবে যান। সেখানে তাকে ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৮১ টাকার একটি চেক দেওয়া হয়, যা তার মোট পাওনার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। অভিযোগ অনুযায়ী, বাকি ৩ লাখ ৭৩ হাজার ১৯ টাকা পরিশোধ করতে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা সরাসরি অস্বীকৃতি জানান, যা বাদীর মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই অস্বীকৃতি তাকে আরও দৃঢ়ভাবে আইনি পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করে।
মামলায় আশিক মোল্লা আরও অভিযোগ করেন যে, যখন তিনি অবশিষ্ট পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য জোরালো দাবি জানাতে থাকেন, তখন তাকে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এই গুরুতর হুমকি তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেন। একজন সাবেক কর্মচারীর প্রতি এমন আচরণ কেবল অনৈতিকই নয়, বরং আইনত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা একটি সভ্য সমাজে কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আদালত বাদীর বিস্তারিত জবানবন্দি এবং উত্থাপিত অভিযোগসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে সেগুলোকে আমলে নিয়েছেন। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর রহমান অভিযুক্ত চার কর্মকর্তা – ঢাকা ক্লাবের সভাপতি শামীম হোসেন, ডাইরেক্টর ফাইন্যান্স তুহিন রেজা, সিও ও সচিব লে. কর্নেল (অব.) ছাব্বির আহম্মেদ এবং চিফ ফাইন্যান্স অফিসার ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের পথে প্রথম ধাপ শুরু হয়েছে এবং অভিযুক্তদের এখন আদালতের মুখোমুখি হতে হবে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের জবাব দিতে।
এই মামলাটি কেবল একজন সাবেক কর্মচারীর ব্যক্তিগত পাওনা আদায় সংক্রান্ত বিষয় নয়, বরং দেশের শ্রম আইন এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। ঢাকা ক্লাবের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী ও অভিজাত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় তা জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই মামলার নিষ্পত্তি কীভাবে হয়, তা দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট মহল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। এটি ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অধিকার রক্ষা এবং কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিতকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে।