চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও থানার শমসের পাড়া এলাকায় সংঘটিত ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিন তাহসিন হত্যা মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে (২৫) শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট, ২০২৬) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা সাত্তারের আদালত এই চাঞ্চল্যকর আদেশ দেন, যা মামলার তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ডেভিড ইমন ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মৃত মো. মুসার ছেলে এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শমসের পাড়া এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিন তাহসিনকে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের বাবা মো. মুসা বাদী হয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেনসহ মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে চান্দগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার অন্য আসামিরা ছিলেন সাজ্জাদের সহযোগী মো. হাসান, মোহাম্মদ, খোরশেদ ওরফে খালাতো ভাই খোরশেদ এবং মো. হেলাল। এই মামলা দায়েরের পর থেকেই পুলিশ মূল অভিযুক্তদের ধরতে জোরদার অভিযান চালিয়ে আসছিল।
নিহত তাহসিন ইট ও বালুর ব্যবসা করতেন। তার ব্যবসার জন্য আনা বালু ও ইট শমসের পাড়ার উদুপাড়া এলাকায় মজুত করে রাখা হতো। ঘটনার দিন বিকেল সোয়া ৪টার দিকে মজুতের জন্য এক ট্রাক বালু আনা হয়েছিল এবং তাহসিন সেসময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। এজাহার সূত্রে জানা যায়, এর কিছুক্ষণ পরই শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন তার সহযোগীদের নিয়ে একটি মাইক্রোবাসে করে সেখানে এসে ব্যবসায়ী তাহসিনকে লক্ষ্য করে গুলি করে এবং দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়, যা এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ডিসি (প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ হাসান ইকবাল চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ২০২৪ সালের আফতাব উদ্দিন তাহসিন হত্যা মামলায় মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছিল। শুনানি শেষে আদালত এই আবেদন মঞ্জুর করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে সিএমপিতে বিভিন্ন ধারায় মোট সাতটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব গুরুতর মামলায় পর্যায়ক্রমে তাকে গ্রেফতার দেখানোর জন্য আদালতে আবেদন করা হবে বলে তিনি জানান, যা তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতা নির্দেশ করে।
গত ২৯ জুলাই যশোরের কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে ডেভিড ইমনসহ আরও চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। তার গ্রেফতারের পর চট্টগ্রামের একাধিক চাঞ্চল্যকর মামলার রহস্য উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ জুন পাহাড়তলী এলাকায় সংঘটিত মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং ধারাবাহিক গোয়েন্দা অভিযানের ভিত্তিতে ডেভিড ইমনের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। এই গ্রেফতারের ফলে তার বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য মামলার তদন্তেও গতি আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
গ্রেফতারকৃত আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৩০ জুলাই ভোরে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর এলাকার একটি পরিত্যক্ত বসতবাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি এবং অন্যান্য দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা হয়, যা ডেভিড ইমনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আরও প্রমাণ দেয়। ব্যবসায়ী তাহসিন হত্যা মামলায় ডেভিড ইমনকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর এই আদালতের আদেশ দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচারের পথে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং এই মামলার তদন্ত নতুন মাত্রা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই ঘটনাটি আবারও সমাজের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য এবং তাদের অপরাধ জগতের ব্যাপকতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। ডেভিড ইমনের মতো কুখ্যাত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে সমাজে স্বস্তি ফিরবে এবং অপরাধ প্রবণতা হ্রাস পাবে বলে সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও এই মামলার তদন্তে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং আশা করা হচ্ছে যে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উন্মোচিত হবে এবং জড়িত সকল অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।