রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার সিদ্ধার্থ তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর সম্ভাব্য সিসি ক্যামেরার উপস্থিতি সম্পর্কে সন্দেহ হওয়ায় সে বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়, যা এক ভয়াবহ শর্টসার্কিটের জন্ম দিয়েছিল। এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের বিনাশ নয়, বরং অপরাধের পর প্রমাণ লোপাটের এক পরিকল্পিত প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়, যা পুরো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এক গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে সিদ্ধার্থ জানিয়েছে, সেই ভয়াল রাতের শেষে যখন ভোরের আলো সবেমাত্র ফুটছিল, তখন সে এবং মুগ্ধ দাস ছাদ থেকে নেমে আসে। ছাদে তারা শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী এবং মেয়েকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। এরপর তারা যখন নিচের কক্ষে আসে, তখন বিছানায় বসে জেগে ছিল গণপতি চক্রবর্তীর ছোট নাতি আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম। সিদ্ধার্থকে চিনতে পারায় নির্দয়ভাবে তাকেও হত্যা করা হয়, যা এই হত্যাকাণ্ডের বীভৎসতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়ার এই ঘটনা জনমনে গভীর ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি করেছে।
পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যার পর সিদ্ধার্থের মনে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে ধরা পড়ার ভয় কাজ করছিল। সেই আশঙ্কা থেকেই সে একটি পুরোনো প্লাস নিয়ে নিচতলায় যায় এবং বৈদ্যুতিক মিটারের তার কেটে ফেলে। তার এই অপচেষ্টার ফলে তৎক্ষণাৎ একটি বড় ধরনের শর্টসার্কিট হয় এবং বাড়ির মূল বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই সময় মুগ্ধ দাস ওপরের তলায় অবস্থান করছিল বলে সিদ্ধার্থ জানিয়েছে। প্রমাণ লোপাটের এই কৌশল অপরাধীদের ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনার অংশ ছিল, যা তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন যে, হত্যাকাণ্ডের পরপরই অভিযুক্তরা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে, যার ফলে শর্টসার্কিট হয়ে মূল লাইন বিচ্ছিন্ন হয়। পুলিশ স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত অভিযান চালিয়ে সিদ্ধার্থ এবং মুগ্ধ দাসকে আটক করতে সক্ষম হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা কিছু তথ্য গোপন করার চেষ্টা করলেও, পরবর্তীতে আদালতের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে পুরো ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী আরও উল্লেখ করেন যে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাইরে অনেকে বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, পুলিশ সঠিক পথেই তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। অভিযুক্তরা আদালতের সামনে নির্ভুলভাবে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে, যা তদন্তকে আরও শক্তিশালী করেছে। পুলিশ আশা করছে, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে দাখিল করা সম্ভব হবে, যা ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে।
রংপুরের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রশমনে পুলিশের দ্রুত ও পেশাদারী তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের পুরো পরিবারকে এভাবে শেষ করে দেওয়ার ঘটনা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা এবং অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির পথ খুলে দিয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীরা তাদের কৃতকর্মের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।