বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) কম্পিউটার অপারেটর পদে কর্মরত সোহান মিয়ার চাকরি স্থায়ীকরণের উদ্যোগ নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, সংশ্লিষ্ট পদে আবেদনের জন্য নির্ধারিত স্নাতক পাসের যোগ্যতা পূরণ না করেই তিনি এই পদে যোগদান করেছিলেন এবং প্রায় ১৪ বছর ধরে চাকরিতে বহাল রয়েছেন। এরই মধ্যে তিনি একাধিকবার পদোন্নতি ও আপগ্রেডেশনও পেয়েছেন। বর্তমানে তার সর্বশেষ আপগ্রেডেশন স্থায়ী করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আবারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্রমতে, সোহান মিয়া যখন কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগ পান, তখন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) সনদ। অথচ এই পদের জন্য স্নাতক ডিগ্রিধারী হওয়া আবশ্যক। প্রাথমিক পর্যায়ে এই বিধিবহির্ভূত নিয়োগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে একটি তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে, সেই তদন্ত আর আলোর মুখ দেখেনি। উল্টো, তদন্ত প্রক্রিয়া থামিয়ে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম-কানুনের প্রতি চরম অবজ্ঞার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে রবিবার (১৬ আগস্ট) অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কনফার্মেশন বোর্ডকে ঘিরে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সোহান মিয়াসহ মোট ২৫ জন কর্মচারীর আপগ্রেডেশন স্থায়ী করার বিষয়টি এই বোর্ডে বিবেচনার জন্য উত্থাপন করেছে। এই ২৫ জন কর্মচারীর গণহারে পদোন্নতি ও আপগ্রেডেশন প্রক্রিয়াটিও বিধিবহির্ভূতভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা নিয়ে আগেও বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) গত ১৫ জুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল, যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয় যে, প্রদত্ত আপগ্রেডেশনগুলো নিয়মবহির্ভূত হওয়ায় তাদের জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়নি। একইসঙ্গে, ইউজিসি এসব আপগ্রেডেশন বাতিল করে সংশ্লিষ্টদের দেওয়া অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে কমিশনকে অবহিত করার কঠোর নির্দেশ দেয়। এই নির্দেশনার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের চাকরি স্থায়ী করার উদ্যোগ নেওয়ায় ইউজিসির নির্দেশনাকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষ করে সোহান মিয়ার চাকরি স্থায়ীকরণের উদ্যোগটি নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ তার নিয়োগের সময় থেকেই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্র পর্যালোচনা করেও দেখা গেছে যে, তিনি নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেননি। এমন পরিস্থিতিতে ইউজিসির স্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষা করে তার চাকরি স্থায়ী করার চেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।
অতীতেও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সনদ ও অভিজ্ঞতার তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। সেই ঘটনায় তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল জলিল মিয়াসহ পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা চলমান রয়েছে এবং তৎকালীন উপাচার্যকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। বর্তমান ঘটনাটি সেই পুরোনো দুর্নীতির ছায়া ফেলছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে কনফার্মেশন বোর্ডের সদস্য গণিত বিভাগের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম জানান, তিনি সম্প্রতি ঢাকা থেকে ফিরেছেন এবং বোর্ডের ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানেন না। অভিযুক্ত সোহান মিয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. শওকাত আলী এই বিষয়ে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করে বলেন, “আবেদন যে কেউ করতেই পারে। আবেদন করলেই তো আর তাকে স্থায়ী করা হয় না।” তবে তার এই মন্তব্য বর্তমান বিতর্ক নিরসনে পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীরা।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ম ও বিধির তোয়াক্কা না করে কর্মচারী নিয়োগ ও পদোন্নতির একটি প্রবণতা বিদ্যমান, যা ইউজিসির মতো নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার নির্দেশনাকেও অগ্রাহ্য করছে। এমন ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দিচ্ছে।