শ্রাবণের এক স্নিগ্ধ সন্ধ্যায় ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তন যেন সুরের আবেশে মূর্ত হয়ে উঠেছিল। উপমহাদেশের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লার একক সংগীতানুষ্ঠানটি শুধু একটি পরিবেশনা ছিল না, বরং ছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের স্মৃতি, ভালোবাসা ও অনুভূতির এক সুরময় উদযাপন। ২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনটি প্রকৃতির বর্ষণস্নাত আবহের সঙ্গে শিল্পীর জাদুকরী কণ্ঠের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছিল, যা শ্রোতাদের মনকে এক ভিন্ন জগতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
এই বিশেষ আয়োজন ঘিরে দর্শক-শ্রোতাদের আগ্রহ ছিল অভাবনীয়। জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনের ৭০০ আসন পূর্ণ ছিল ২৭ থেকে ৭৭ বছর বয়সী শ্রোতাদের উপস্থিতিতে, যা রুনা লায়লার গানের সর্বজনীন আবেদনকে প্রমাণ করে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, টিকিট বিক্রি শুরুর প্রথম দিনেই সমস্ত টিকিট শেষ হয়ে যায়। বহু অনুরাগী টিকিট না পেয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন, যা এই কিংবদন্তি শিল্পীর প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা ও সম্মানেরই প্রতিফলন।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার কিছু পর মঞ্চে এসে রুনা লায়লা তাঁর পরিবেশনা শুরু করেন বাংলা ভাষা ও দেশের জন্য আত্মদানকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে। এরপর তিনি দেশাত্মবোধক গান ‘দেশের জন্য যারা’ পরিবেশনের মাধ্যমে সুরের এই যাত্রা শুরু করেন। এই উদ্বোধনী পরিবেশনা মিলনায়তনে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে, যা শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে যায় এবং উপস্থিত সকলকে এক ভিন্ন মাত্রার অনুভূতিতে ভাসিয়ে তোলে।
এরপর একে একে তিনি ‘শিল্পী আমি’, ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘গানেরই খাতায়’, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ‘আমায় গেঁথে দাও না’, ‘বন্ধু তিন দিন’, ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে’, ‘সাধের লাউ’—এর মতো জনপ্রিয় গানগুলো পরিবেশন করেন। এই আয়োজনটির বিশেষ আকর্ষণ ছিল প্রথমবারের মতো মঞ্চে তাঁর কণ্ঠে নজরুলসংগীত ‘ভুলিতে পারি না’ পরিবেশনা, যা শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। প্রায় দেড় ঘণ্টার এই আসরের পরিসমাপ্তি ঘটে রাত সোয়া ৯টায় দর্শকদের বিশেষ অনুরোধে বহুল জনপ্রিয় ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ গানটি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। সব মিলিয়ে তিনি মোট এগারোটি গান গেয়ে শোনান। প্রতিটি গানের শেষে মিলনায়তনজুড়ে করতালির শব্দ যেন এক অবিরাম সুরের বৃষ্টি হয়ে ঝরছিল, যা প্রমাণ করে রুনা লায়লার গান সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজও সমান আবেদনময় ও চিরন্তন।
শুধু গান নয়, পরিবেশনার ফাঁকে ফাঁকে রুনা লায়লা তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবনের নানা স্মৃতি ও মজার ঘটনা দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করে নেন। তাঁর প্রাণবন্ত কথাবার্তা, সহজাত রসবোধ এবং দর্শকদের সঙ্গে আন্তরিক যোগাযোগ পুরো আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। ‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব’ শিরোনামের এই আয়োজনটি ছিল শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ একক কনসার্ট। যদিও দীর্ঘ সংগীতজীবনে দু-তিনবার এই মঞ্চে তিনি গান গেয়েছেন, তবে একক আয়োজন এবারই প্রথম। অভিনেতা, নির্মাতা ও উপস্থাপক আফজাল হোসেন যখন তাঁর ৬২ বছরের পেশাদার সংগীতজীবনের পর এই মঞ্চে প্রথম একক অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করেন, তখন রুনা লায়লা মজার ছলে বলে ওঠেন, “অবশেষে ডেকেছে, এটাই তো!” তিনি আরও বলেন, নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য এমন আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে রুনা লায়লা তাঁর প্রথম মঞ্চে গান গাওয়ার স্মৃতিচারণ করেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে করাচিতে তাঁর প্রথম মঞ্চ পরিবেশনার গল্পটি ছিল বেশ আকস্মিক। তাঁর বড় বোন দিনারের অসুস্থতার কারণে ছোট্ট রুনাকে মঞ্চে ওঠানো হয়, আর সেই অপ্রত্যাশিত সুযোগই তাঁর জীবনের প্রথম মঞ্চ অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে পাকিস্তানে পেশাদার সংগীতশিল্পী হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। ৬২ বছর পেরিয়েও তাঁর সেই পথচলা আজও সমান উজ্জ্বল ও গতিশীল। বাংলা, হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, পশতুসহ ১৮টি ভাষায় দশ সহস্রাধিক গানে কণ্ঠ দিয়ে তিনি নিজেকে উপমহাদেশের অন্যতম কিংবদন্তি শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত একজন দর্শক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম, পরিবারসহ ছয়টি টিকিট কেটে এই অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। তিনি বলেন, “এ বয়সেও রুনা লায়লার এনার্জি আর কণ্ঠের শক্তি সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমাদের দেশের কিংবদন্তি শিল্পীদের নিয়ে আরও বেশি টিকিটের বিনিময়ে অনুষ্ঠান হওয়া উচিত। এতে শিল্পী ও শিল্প—দুটোরই মূল্যায়ন বাড়বে। শুধু বিদেশি শিল্পীদের পেছনে না ছুটে আমাদের নিজস্ব রত্নদের সম্মান জানানো উচিত।” এই মন্তব্যটি যেন উপস্থিত সকল শ্রোতারই মনের কথা ছিল। রুনা লায়লার এই পরিবেশনা কেবল একটি রাতকে সুরময় করে তোলেনি, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।