রবিবার, 13 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
মধ্যপ্রাচ্য 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

ইরানের হামলায় উৎপাদন ব্যাহত: বৃহত্তম উৎপাদক হয়েও যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্যাস কিনছে কাতার

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলায় কাতারের গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটি এখন নিজেদের চাহিদা পূরণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস আমদানির চুক্তি খুঁজছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাস উৎপাদনকারী হয়েও কাতারের এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

শেয়ার করুন:
ইরানের হামলায় উৎপাদন ব্যাহত: বৃহত্তম উৎপাদক হয়েও যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্যাস কিনছে কাতার

বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও কাতার এখন নিজেদের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো বহাল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্যাস আমদানির জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সম্পাদনে আলোচনা চালাচ্ছে। গত মার্চে ইরানের এক হামলায় কাতারের গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাণিজ্য ও জ্বালানি শিল্প সংশ্লিষ্ট তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, কাতারএনার্জি ২০৩১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি কেনার জন্য একাধিক মার্কিন উৎপাদনকারীর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

২২ জুন, ২০২৬ তারিখে কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী ও কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাদ শেরিদা আল-কাবি এই সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ইরানের হামলায় কাতারের রাস লাফান এলএনজি স্থাপনার ১৪টি ট্রেনের মধ্যে দুটি এবং একটি গ্যাস-টু-লিকুইডস (জিটিএল) স্থাপনা ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়। এর ফলস্বরূপ, কাতারের এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতায় এক বিশাল ধাক্কা লাগে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ আল-কাবি গত মার্চেই জানিয়েছিলেন যে, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর মেরামত সম্পন্ন করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে বছরে ১ কোটি ২৮ লাখ টন এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা বন্ধ থাকবে, যা কাতারের মোট উৎপাদন ক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। এই উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর থেকেই কাতারএনার্জি প্রতি মাসে ‘ফোর্স মেজর’ নোটিশ নবায়ন করছে এবং সর্বশেষ নভেম্বর পর্যন্ত এর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল এখনও অনিশ্চিত থাকায় এই নোটিশের মেয়াদ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

এই সংকট মোকাবেলায় কাতারএনার্জির ট্রেডিং শাখা, কাতারএনার্জি ট্রেডিং, বর্তমানে ২০৩১ সাল পর্যন্ত বছরে ২০ থেকে ৩০ লাখ টন এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এই শাখাটি প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১ কোটি টনের এলএনজি পোর্টফোলিও পরিচালনা করে থাকে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে মন্তব্য করেছে, “তাদের হাতে যা-ই আসবে, সেটাই কিনতে হবে।” এই বিষয়ে কাতারএনার্জির কাছে তাৎক্ষণিক মন্তব্য জানতে চাইলেও রয়টার্স কোনো জবাব পায়নি। ভেঞ্চার গ্লোবাল ও চেনিয়ের মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, আর উডসাইড এলএনজি বাজারের জল্পনা নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‍্যাপিডান এনার্জির সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে নির্মাণাধীন এলএনজি প্রকল্পগুলো থেকে মোট ২ কোটি ৫০ লাখ টন গ্যাস কেনার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবিক্রীত সক্ষমতা রয়েছে ভেঞ্চার গ্লোবালের হাতে, যা বছরে প্রায় ১ কোটি টন। চেনিয়ের ও উডসাইড এনার্জির কাছে রয়েছে আরও ৬০ লাখ টন করে এবং সেম্পরার পোর্ট আর্থার এলএনজি প্রকল্প থেকে বিক্রির জন্য রয়েছে আরও ৩০ লাখ টন। এই বিপুল সরবরাহ কাতারের চাহিদা পূরণে সহায়ক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এনার্জি গবেষণা ও পরামর্শ প্রতিষ্ঠান এমএসটি মার্কির প্রধান জ্বালানি গবেষক সল কেভোনিক বলেন, “অন্য উৎপাদকদের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি কেনার জন্য কাতারের বর্তমান তৎপরতা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, আগামী কয়েক বছর নিজস্ব এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা নিয়ে কাতার ঝুঁকি দেখছে।” তার মতে, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং কাতারের এলএনজি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতিও প্রথমে যতটা ধারণা করা হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি হতে পারে। ফলে মেরামত শেষ করতে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সময় লাগার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা কাতারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।

কাতারের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির স্বাভাবিক সময়ে এলএনজি রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে যায়। কিন্তু হরমুজ প্রণালি দিয়ে কবে আবার স্বাভাবিকভাবে জাহাজ চলাচল শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় এশিয়ার অনেক ক্রেতা ইতিমধ্যে কাতারি এলএনজির বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছেন। একটি সূত্র জানিয়েছে, বাজারের কিছু অংশগ্রহণকারী এমন পরিস্থিতিও যাচাই করছেন, যেখানে কাতার থেকে কোনো গ্যাসই পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ, ইরানের হামলা শুধু কাতারের উৎপাদন সক্ষমতাকেই চাপে ফেলেনি, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চেইনে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে পুনর্গঠিত করতে পারে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ