বৃহস্পতিবার, 15 অক্টোবর 2026
⚠ ব্রেকিং
মধ্যপ্রাচ্য 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

হরমুজ প্রণালিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই জাহাজ ডুবি: আঞ্চলিক উত্তেজনা তুঙ্গে

গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালির কাছে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ডুবে গেছে। সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি কনটেইনারবাহী জাহাজ এবং অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজ এই হামলার শিকার হয়। সাম্প্রতিক এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।

শেয়ার করুন:
হরমুজ প্রণালিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই জাহাজ ডুবি: আঞ্চলিক উত্তেজনা তুঙ্গে

মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছে গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবে গেছে, যা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মকর্তারা গতকাল এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গত ১০ দিনে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের আশেপাশে জাহাজে হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান এই হামলার তীব্রতা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেশটির বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং গত মাসে আরোপিত কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করছে, যা বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের জন্য নতুন এক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

ডুবে যাওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী জিএফএস প্রাইড নামের একটি ছোট কনটেইনারবাহী জাহাজ। সামুদ্রিক নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সময় এটি হামলার শিকার হয় এবং পরবর্তীতে ডুবে যায়। সিঙ্গাপুরের সামুদ্রিক ও বন্দর কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, হামলায় জিএফএস প্রাইডে প্রথমে আগুন ধরে যায় এবং পরে সেটি সম্পূর্ণরূপে ডুবে যায়। তবে, জাহাজটির ২১ জন নাবিককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে এবং এই ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, যা একটি স্বস্তিদায়ক দিক। এই জাহাজটির একটি ছবি ২০১৪ সালের ১১ আগস্ট নেদারল্যান্ডসের রোজেনবার্গে তোলা হয়েছিল, যা রয়টার্সের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

পৃথক আরেকটি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী কেপ দাও নামের একটি পণ্যবাহী জাহাজ। আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচল সংস্থার (আইএমও) তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর ক্ষেপণাস্ত্রসদৃশ কোনো বস্তুর আঘাতে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং গতকাল সেটি প্রণালির কাছে ডুবে যায়। এই হামলায় দুঃখজনকভাবে একজন নাবিক নিহত হয়েছেন বলে সামুদ্রিক নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। হামলার পরপরই জাহাজটির অন্য নাবিকদের সফলভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক জাহাজটির ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান পিওনিজ শিপম্যানেজমেন্ট এফজেইর সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি, যা ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে কিছুটা বাধা সৃষ্টি করেছে।

আইএমও-এর জাহাজ দুর্ঘটনাসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে ডুবে যাওয়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় জাহাজ হলো জিএফএস প্রাইড ও কেপ দাও। এই দুটি ঘটনা এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকির স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম তেল পরিবহন রুট, এবং এখানে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক এই হামলাগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

সিঙ্গাপুরের সামুদ্রিক ও বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে অব্যাহত হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, এই ধরনের হামলা সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে চালানো হচ্ছে এবং এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাদের মতে, এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক জিএফএস প্রাইডের ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান জিএফএস শিপ ম্যানেজমেন্ট এফজেইর সঙ্গেও তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের নীরবতা ঘটনার পেছনের কারণ এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও প্রশ্ন তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুতর বলে মনে করছেন এবং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করছেন।

সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান মারিস্কস গতকাল তাদের এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আবারও প্রমাণ করছে যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকি এখনো রয়ে গেছে।’ প্রতিষ্ঠানটি আরও সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, ‘শুধু তেলবাহী ট্যাংকার নয়, কনটেইনারবাহী জাহাজ ও পণ্যবাহী জাহাজও গুরুতর হুমকিতে আছে।’ এই বিবৃতিটি ইঙ্গিত দেয় যে, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ঝুঁকি কেবল নির্দিষ্ট ধরনের জাহাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামগ্রিকভাবে বাণিজ্যিক নৌচলাচলকে প্রভাবিত করছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এই ঘটনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। হরমুজ প্রণালির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর বারবার হামলা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে অবিলম্বে উত্তেজনা প্রশমন এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ