বৃহস্পতিবার, 15 অক্টোবর 2026
⚠ ব্রেকিং
মধ্যপ্রাচ্য 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

রিয়াদ বিমানবন্দর হামলার দাবিতে ছড়ানো ভাইরাল ভিডিওগুলো আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সৃষ্ট বিভ্রান্তি

সম্প্রতি রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার পর অনলাইনে অসংখ্য ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিডব্লিউ ফ্যাক্ট চেক নিশ্চিত করেছে যে, এর মধ্যে অনেক ভাইরাল ভিডিওই ভুয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে, যা ব্যাপক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।

শেয়ার করুন:
রিয়াদ বিমানবন্দর হামলার দাবিতে ছড়ানো ভাইরাল ভিডিওগুলো আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সৃষ্ট বিভ্রান্তি

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার দাবি করেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার থেকে এ পর্যন্ত এসব হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। এই সংবেদনশীল খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে হামলার দৃশ্য দাবি করে অসংখ্য ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তবে, ডিডব্লিউ ফ্যাক্ট চেক সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলো এই ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাই করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচন করেছে। যদিও হামলার কিছু প্রকৃত ফুটেজ এবং এর পরবর্তী দৃশ্যের ভিডিও অনলাইনে প্রচারিত হয়েছে, ডিডব্লিউ ফ্যাক্ট চেক প্রমাণ পেয়েছে যে ভাইরাল হওয়া অনেক ভিডিওই আসল নয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। এসব ভিডিওতে এআই-সৃষ্ট বিষয়বস্তুর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

একটি নির্দিষ্ট ভিডিও, যা এক্স (পূর্বে টুইটার) প্ল্যাটফর্মে ১.৭ মিলিয়ন বারের বেশি দেখা হয়েছে, দাবি করা হয়েছে যে এটি বিমানবন্দরে হামলার মুহূর্তের দৃশ্য। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভিডিওটি ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে অনলাইনে রয়েছে, যা সাম্প্রতিক হামলার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ভিডিওটির অস্থির ক্যামেরা মুভমেন্ট এবং ঝাপসা ফুটেজ এআই-সৃষ্ট বিষয়বস্তুর ত্রুটিগুলো আড়াল করতে সাহায্য করেছে। তবে, ফ্রেম-বাই-ফ্রেম বিশ্লেষণে বেশ কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়েছে, যা ভিডিওটি এআই-জেনারেটেড হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে।

প্রথমত, ভিডিওটিতে দেখা যায় যে একটি বিস্ফোরণ ঘটার সময় মানুষ একটি কাচের দরজার দিকে দৌড়াচ্ছে, যা বিপদ থেকে বাঁচার জন্য স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ সাধারণত বিস্ফোরণের উৎস থেকে দূরে সরে যায়। দ্বিতীয়ত, ভিডিওটির প্রায় ১০ সেকেন্ডে একজন ব্যক্তির মাথার পাশে একটি স্মার্টফোন হাতে ধরা একটি হাতের ছবি হঠাৎ করে ভেসে ওঠে, যা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক। ১২ সেকেন্ডের মাথায় আরেকজন ব্যক্তিকে প্রথমে হাতবিহীন অবস্থায় দেখা যায়, এবং পরক্ষণেই অলৌকিকভাবে তার হাত ফিরে আসে। মেটার নিজস্ব এআই শনাক্তকরণ টুলও ভিডিওটিতে এআই-এর স্বাক্ষর খুঁজে পেয়েছে এবং নিশ্চিত করেছে যে এটি জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।

এই ভুয়া ভিডিওটি ব্যাপক আকারে শেয়ার করা হয়েছে এবং এটি আরবি, ইংরেজি, রাশিয়ান, স্প্যানিশ, তুর্কি, থাই সহ বিভিন্ন ভাষায় ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি টাইমস অব ইসরায়েল-এর মতো কিছু সুপরিচিত সংবাদমাধ্যমও এটিকে খাঁটি ধরে নিয়ে প্রকাশ করেছিল, যার ফলে তাদের পোস্টটি লেখার সময় পর্যন্ত ২৫৬,০০০ বারের বেশি দেখা হয়েছিল। ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক এবং ফেসবুক সহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলোতেও ভিডিওটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে, যা ভুল তথ্যের দ্রুত বিস্তারের একটি উদাহরণ।

আরেকটি ভাইরাল ভিডিও, যা এক্স-এ ২.৯ মিলিয়ন বারের বেশি দেখা হয়েছে, দাবি করা হয়েছে যে এটি রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার নতুন ফুটেজ। তবে, এই ভিডিওটিও এআই-জেনারেটেড এবং আসল বিমানবন্দরের সাথে এর বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। একটি রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে দেখা গেছে যে এই ভুয়া ভিডিওটি তৈরি করতে একটি স্টক ছবির ডেটাবেস, শাটারস্টক থেকে নেওয়া একটি আসল ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। মূল ছবিটি ২০১৬ সালে আপলোড করা হয়েছিল।

যদিও মূল ছবিটি সামান্য ভিন্ন কোণ থেকে তোলা হয়েছিল, তবে এর সাথে ভিডিওটির অনেক ভিজ্যুয়াল মিল রয়েছে। এর মধ্যে বিমানবন্দরের ছাদের সাদা ত্রিভুজাকার জ্যামিতিক নকশা, বাম দিকের গম্বুজ, লাগেজ পরিবহনকারী যান এবং বিমানের খোলা ও বন্ধ দরজা উল্লেখযোগ্য। তবে, ভিডিওটিতে কিছু উপাদান অনুপস্থিত বা বিকৃত অবস্থায় দেখা গেছে। উদাহরণস্বরূপ, বিমানের বাম দিকের আলোর খুঁটিতে কোনো ল্যাম্প সংযুক্ত দেখা যায়নি। ভিডিওটি দানাদার এবং এতে কিছু ভিজ্যুয়াল ত্রুটি রয়েছে, যেখানে ছবির কিছু অংশ হঠাৎ করে ঝাপসা হয়ে যায়। যখন কথিত ক্ষেপণাস্ত্রটি বিমানে আঘাত হানে, তখন কাছাকাছি থাকা একটি গাড়ির আকৃতি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়ে বাতাসে ছিটকে যায়, যা বাস্তবতার সাথে মেলে না। ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল বিস্ফোরণ এবং এর ফলে সৃষ্ট অগ্নিগোলক সত্ত্বেও, আশেপাশের ভবন বা অন্যান্য বস্তুর উপর এর গুরুতর প্রভাবের অভাবও ভিডিওটির কৃত্রিম প্রকৃতির প্রমাণ।

এই ঘটনাগুলো আবারও প্রমাণ করে যে, বর্তমান ডিজিটাল যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুয়া খবর এবং বিভ্রান্তিমূলক তথ্য তৈরি করা কতটা সহজ হয়ে উঠেছে। সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে বা বড় কোনো ঘটনার সময় এ ধরনের ভুল তথ্য জনমনে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি বাড়াতে পারে। তাই, অনলাইনে কোনো ভিডিও বা ছবি দেখার আগে তার সত্যতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। আকাশ বাণী তার পাঠকদের সর্বদা নির্ভরযোগ্য এবং যাচাইকৃত তথ্য প্রদানের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ