মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করছে, যেখানে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের অভ্যন্তরে একের পর এক হামলা চালিয়ে নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন করছে। গত শনিবার (১০ অক্টোবর, ২০২৬) সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। এই হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই পরদিন রোববার দ্বিতীয় দফায় হামলায় একজন নিহত এবং আরও এগারো জন আহত হন। এরপর গতকাল সোমবার দিবাগত রাতেও তৃতীয়বারের মতো বিমানবন্দরটিতে হামলা চালায় বিদ্রোহীরা, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ক্ষেপণাস্ত্র টার্মিনালে আছড়ে পড়ার মুহূর্তে আতঙ্কিত যাত্রীরা প্রাণ বাঁচাতে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ছেন। রাজধানীর ২২ মাইল উত্তরে অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরটির টার্মিনাল ভবন হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থায় এক বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুতিরা শুধু বিমানবন্দরেই নয়, সৌদি আরবের তেল স্থাপনা এবং লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজেও ধারাবাহিক আক্রমণ চালাচ্ছে। এই অভিযানগুলোকে এখন পর্যন্ত হুতিদের সবচেয়ে বড় সামরিক আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই সহিংসতার আপাতদৃষ্টিতে আরব উপদ্বীপে সীমাবদ্ধ মনে হলেও, এর বৈশ্বিক ঝুঁকি অনেক গভীর ও সুদূরপ্রসারী। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাত বিশ্ববাজারে তেলের দামকে আকাশচুম্বী করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতিকে আরও তীব্র করে তুলবে। এর কারণ হলো, হুতিরা গত মাসেই লোহিত সাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখ বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কবজায় নিয়েছিল। এই নৌপথ দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যের সিংহভাগ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ হয়, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়।
হুতিদের এই আক্রমণের পেছনে সুযোগসন্ধানী কৌশলের পাশাপাশি পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ পরিস্থিতিও কাজ করছে। বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরু করলে হুতিরা প্রথমে কিছুটা নীরব ছিল। কিন্তু বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তাদের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী এবং তাদের মিত্ররা গত সপ্তাহে হুতিদের ওই প্রণালি থেকে হটিয়ে দিতে বড় ধরনের পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করে। সৌদি আরব শুরু থেকেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সব ধরনের সামরিক সমর্থন দিয়ে আসছে, যার ফলস্বরূপ রিয়াদ এখন সরাসরি হুতিদের নিশানায় পরিণত হয়েছে।
হুতিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকগুলোতে হামলা চালাচ্ছে, যা সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক মর্যাদার প্রতীক। এই আঘাতের মাধ্যমে হুতিরা রিয়াদকে স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে যে, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে মদদ দেওয়ার সামরিক খেসারত কতটা চড়া হতে পারে। একইসাথে, তেহরান এই হামলার মাধ্যমে বড় রাজনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে তাদের কথিত 'প্রতিরোধ অক্ষের' অংশ হিসেবে হুতিদের সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে আসছে। লোহিত সাগর ও সৌদি আরবে হুতিদের এই হামলা আবারও প্রমাণ করেছে যে, তেহরান ও তাদের মিত্ররা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ওপর বিশাল প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা রাখে।
হুতিদের সাম্প্রতিক আক্রমণ গত এক দশকের মধ্যে সৌদি আরবের মাটিতে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ঘটনা। এই হামলার কারণে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচলে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ার বড় বড় বিমান সংস্থা রিয়াদের উদ্দেশে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পর্যটনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রিয়াদের বাণিজ্যিক এলাকার শীর্ষ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে এবং নগর কর্তৃপক্ষ এই সপ্তাহে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি পাঠদান বন্ধ রেখে অনলাইন ক্লাসের নির্দেশ দিয়েছে। এমনকি রাজধানীতে নির্ধারিত একটি বড় জ্বালানি সম্মেলন থেকে বিশ্বের শীর্ষ তেল নির্বাহীদের নাম শেষ মুহূর্তে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে, যা সৌদি আরবের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সৌদি আরব সামরিক খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে এবং অস্ত্র আমদানির দিক থেকে দেশটি বিশ্বে অষ্টম স্থানে রয়েছে। এত সামরিক শক্তি ও আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ প্রতিহত করা রিয়াদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষক থমাস জুনো বলেছেন, সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হুতিদের কিছু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে পারলেও, সব হামলা ঠেকানো তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এই ব্যর্থতা সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে এবং আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যে নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে।
সৌদি আরব কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতে পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকলেও, দেশটির নিজস্ব মাটিতে যুদ্ধের সহিংসতা খুব কমই আঘাত হেনেছে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটি নিজেকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে জড়িয়ে ফেলেছে, যা সৌদি শাসকেরা এত দিন যেকোনো মূল্যে এড়িয়ে চলতে চেয়েছিলেন। এই পরিস্থিতি শুধু সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকেই নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটকেও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বিশ্বজুড়ে অনুভূত হতে পারে।