নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর আইনজীবী জিয়াউল ইসলামসহ তিনজনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত মঙ্গলবার রাতে শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁদের আটক করা হয় এবং আজ বুধবার সকালে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে জিয়াউল ইসলাম ছাড়াও রয়েছেন তাঁর ছোট ভাই আতিকুল ইসলাম এবং আইনজীবী মাহবুবুর রহমান। এই গ্রেপ্তারের ঘটনা নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র নিন্দা ও মুক্তির দাবি জানানো হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃত জিয়াউল ইসলাম নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট এবং উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর নারায়ণগঞ্জ জেলার সাবেক সভাপতি হিসেবে পরিচিত। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর দীর্ঘদিনের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে, সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। গ্রেপ্তারকৃত অন্য দুজন, আতিকুল ইসলাম ও মাহবুবুর রহমানও স্থানীয়ভাবে পরিচিত মুখ। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই তিনজনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি পুরোনো মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, যদিও তাঁরা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি নন।
পুলিশ ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ফতুল্লা মডেল থানার পুলিশের একটি দল শহরের আল্লামা ইকবাল রোডের একটি বাসা থেকে জিয়াউল ইসলাম ও তাঁর ভাই আতিকুল ইসলামকে আটক করে। একই সময়ে শহরের দেওভোগ পাক্কা রোড এলাকার বাসা থেকে আইনজীবী মাহবুবুর রহমানকেও আটক করা হয়। আজ সকালে তাঁদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখিয়ে নারায়ণগঞ্জের আদালতে হাজির করা হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করে পুলিশ। ফতুল্লা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নারায়ণগঞ্জ আদালত পুলিশের পরিদর্শক আবদুস সামাদ জানান, পুরোনো একটি মামলায় তাঁদের সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এই গ্রেপ্তারের ঘটনার ঠিক একদিন আগে, গত মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে একটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় জামিন পান সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। ওই মামলায় পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণের বিষয়ে আগামী ১২ ডিসেম্বর শুনানির তারিখ ধার্য করা হয়েছে। জামিন পাওয়ার পর আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সামনে আইভী বলেন, ‘জয় বাংলাকে দাবাইয়া রাখা যাবে না।’ এসময় তাঁকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দেখা যায়। এই ঘটনার সময় আইনজীবী জিয়াউল ইসলাম ফাইল হাতে আইভীর পাশেই হাঁটছিলেন, তবে তাঁকে স্লোগান দিতে দেখা যায়নি। গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানিয়েছে, আইভীর সঙ্গে আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত থাকার সময় বিভিন্ন স্লোগান দেওয়ার কারণেই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জিয়াউল ইসলামসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও তাঁদের দ্রুত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন আইনজীবী সমাজ এবং নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের নেতারা। নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা রফিউর রাব্বি এই গ্রেপ্তারকে বিচারব্যবস্থার প্রতি প্রশ্ন উত্থাপনকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, জিয়াউল ইসলাম ও আতিকুল ইসলাম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সে সময় জিয়াউল সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি হিসেবে জোরালো ভূমিকা পালন করেছিলেন। রফিউর রাব্বি আরও বলেন, একজন আইনজীবী হিসেবে আদালতে উপস্থিত থাকা কোনোভাবেই কাউকে অপরাধী প্রমাণ করে না এবং নতুন করে তাঁদের মামলায় জড়ানো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী এই গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি দলের কর্মী হিসেবে এই তিনজন গতকাল আদালত প্রাঙ্গণে সেলিনা হায়াৎ আইভীর সঙ্গে ছিলেন এবং সেখানে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়। তাঁর মতে, নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবেই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাঁদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের এই ব্যাখ্যা সত্ত্বেও, সমাজের বিভিন্ন স্তরে এই গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
এজাহারভুক্ত আসামি না হয়েও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার এবং পুলিশের ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে আখ্যায়িত করার বিষয়টি আইনি মহলে ভিন্ন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই গ্রেপ্তার নারায়ণগঞ্জ তথা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশেষ করে, সাবেক একজন মেয়রের আইনজীবীকে এভাবে গ্রেপ্তার করা এবং তার সঙ্গে ‘নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মী’ হিসেবে যোগসূত্র দেখানোর বিষয়টি ভবিষ্যতে আরও অনেক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। আইভীর মামলার পরবর্তী শুনানি এবং গ্রেপ্তারকৃতদের রিমান্ড আবেদনের ওপর আদালতের সিদ্ধান্তের দিকেই এখন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ।