মঙ্গলবার, 13 অক্টোবর 2026
⚠ ব্রেকিং
রাজনীতি 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগ: একটি অপরিহার্য সংশোধনের দাবি

বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত করার দীর্ঘদিনের দাবি উঠেছে। অনুচ্ছেদ ১৫২-এ সংসদ, সরকার ও সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের উল্লেখ থাকলেও বিচার বিভাগের অনুপস্থিতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে বেমানান। এই গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় সহায়ক হবে।

শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগ: একটি অপরিহার্য সংশোধনের দাবি

বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোতে একটি দীর্ঘদিনের আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগের অনুপস্থিতি। সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকে দেশের জ্যেষ্ঠ সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষিতে এই প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে, যেখানে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রিজওয়ান-উল-আলম এই বিষয়টি উত্থাপন করেন। ১৯৯৮ সালে বরিশালের ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রথম এই অসঙ্গতিটি লক্ষ্য করেন এবং তখন থেকেই এর একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যার সন্ধানে রয়েছেন, যা আজও মেলেনি। এই পুনরালোচনার সূত্র ধরে রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত করার অপরিহার্যতা নিয়ে নতুন করে ভাবনা শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫২ নম্বর অনুচ্ছেদে 'রাষ্ট্র' বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তার একটি ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। বর্তমান সংজ্ঞানুসারে, রাষ্ট্র বলতে সংসদ, সরকার এবং সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষকে বোঝানো হয়। তবে লক্ষণীয়ভাবে, এই সংজ্ঞায় বিচার বিভাগের কোনো উল্লেখ নেই। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি তিনটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত: আইন প্রণয়নের জন্য সংসদ, সেই আইন বাস্তবায়নের জন্য সরকার এবং আইন ব্যাখ্যা ও অন্য দুটি স্তম্ভের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য বিচার বিভাগ। আমাদের সংবিধান এই ত্রি-স্তরীয় কাঠামোকে স্বীকৃতি দেয় এবং বিচার বিভাগের জন্য একটি পৃথক অংশও নির্ধারণ করেছে, যেখানে বিচারকদের স্বাধীনতার কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি ২২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখবে, যা বিচারিক স্বাধীনতার গুরুত্বকে আরও জোরালো করে।

সংবিধানের অন্যান্য অংশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর জোর দেওয়া হলেও রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় এর অনুপস্থিতি এক ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি করে। মাসদার হোসেন মামলার রায়েও এই বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, বিচার বিভাগীয় চাকরি প্রজাতন্ত্রের চাকরি হলেও তা সাধারণ সরকারি চাকরির মতো নয়, বরং এর স্বকীয়তা রয়েছে। আদালতও বিভিন্ন সময়ে সরকারের কার্যক্রম পরীক্ষা করার সময় বিচার বিভাগকে রাষ্ট্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই দেখে থাকে। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগের এই বাদ পড়াটা কেবল একটি ক্ষুদ্র বিষয় নয়, বরং এর গভীর সাংবিধানিক ও ব্যবহারিক প্রভাব রয়েছে। এই অনুপস্থিতি একটি মানসিকতা তৈরি করে, যেখানে আদালতকে রাষ্ট্রের একটি সমান অংশীদার হিসেবে না দেখে, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারের একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হতে পারে।

সম্প্রতি এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেখা গেছে যখন একটি অন্তর্বর্তী সরকার সুপ্রিম কোর্টের অধীনে একটি সচিবালয় গঠনের অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মাসদার হোসেন মামলার চেতনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অধস্তন আদালতের প্রশাসনকে সুপ্রিম কোর্টের হাতে রাখা। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই অধ্যাদেশটি বাতিল করে দেয়। এই ঘটনাটি একটি বৃহত্তর প্রবণতাকে নির্দেশ করে: যখন বিচার বিভাগ তার প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়, তখন রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রায়শই তাকে পিছিয়ে দেয়। রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগের সুস্পষ্ট অন্তর্ভুক্তি এই ধরনের মতবিরোধ সম্পূর্ণ বন্ধ না করলেও, বিচারিক স্বাধীনতাকে একটি ঐচ্ছিক বিষয় না ভেবে বরং একটি সাংবিধানিক ভিত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি করবে।

বিচার বিভাগকে রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করার বিরুদ্ধে একটি সাধারণ আপত্তি শোনা যায় যে, এতে 'রাষ্ট্র বনাম অমুক' মামলায় আদালত নিজেই একটি পক্ষ হয়ে যাবে, যা বিচারকের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ করবে। তবে এই যুক্তিটি ধোপে টেকে না। ফৌজদারি মামলায় 'রাষ্ট্র' শব্দটি কেবল জনস্বার্থের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ এই নয় যে সংসদ বা সমস্ত সরকারি সংস্থাই মামলার পক্ষ। প্রকৃত অর্থে, এক্ষেত্রে সরকারই পক্ষ হয়ে থাকে। তাই 'সরকার বনাম অমুক' বলাই অধিকতর সঠিক। সংজ্ঞায় বিচার বিভাগ যোগ করলে বিচারক কোনো মামলার পক্ষ হয়ে যান না। বরং আগের মতোই প্রসঙ্গ অনুসারে ব্যতিক্রম রাখার সুযোগ থাকে। আন্তর্জাতিক মামলাতেও এর কোনো প্রভাব পড়বে না, কারণ বিদেশে বাংলাদেশকে একটি একক রাষ্ট্র হিসেবেই দেখা হয় এবং এর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বিভাজন আমাদের নিজস্ব বিষয়।

এই সংশোধনী আনা অত্যন্ত সহজ হতে পারে, যদি সদিচ্ছা থাকে। অনুচ্ছেদ ১৫২-এ বিচার বিভাগকে যোগ করে বলা যেতে পারে যে, রাষ্ট্র মানে সংসদ, সরকার, বিচার বিভাগ ও সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ। এর সঙ্গে আরও একটি বাক্য যোগ করা যেতে পারে যে, সাধারণ বিচারিক রায় শুধু এই কারণেই সরকারি সিদ্ধান্তের মতো চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। এই সংযোজন বিচারকদের নিরপেক্ষ ভূমিকা অক্ষুণ্ন রাখবে এবং অনুচ্ছেদ ২২ ও সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এটি কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন নয়; এর ফলে নতুন কোনো সচিবালয় তৈরি হবে না বা নিয়োগ পদ্ধতিতেও কোনো পরিবর্তন আসবে না। এটি শুধুমাত্র একটি দীর্ঘদিনের পুরোনো নীরবতাকে ভাঙবে, যা বিচার বিভাগের সাংবিধানিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অপরিহার্য।

সংবিধানের শব্দ মানুষের চিন্তা ও ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। একটিমাত্র ধারা পরিবর্তন করলেই সবক্ষেত্রে রাতারাতি পরিবর্তন আসবে না, তবে যখন পাঠ্য নিজেই বিচার বিভাগকে বাইরে রাখে, তখন তার স্বাধীনতাকে ভিত্তিগত অধিকারের পরিবর্তে একটি অনুগ্রহ হিসেবে দেখার সুযোগ বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ এই অসম্পূর্ণতার জন্য দীর্ঘকাল ধরে একটি মূল্য দিয়ে আসছে। বর্তমানে যখন সংবিধান নিয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে, তখন এই ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ফাঁকটি বন্ধ করার একটি সুবর্ণ সুযোগ এসেছে। অনুচ্ছেদ ১৫২-এ বিচার বিভাগ যোগ করা মানে সাংবিধানিকভাবে স্বীকার করে নেওয়া যে, রাষ্ট্রের তিনটি পূর্ণাঙ্গ অংশই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এটি অনুচ্ছেদ ২২-এর নীতিকে আরও মজবুত করবে এবং বিচার প্রশাসনের স্বাধীনতা রক্ষায় ভবিষ্যতের কাজকে সহজতর করবে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ