বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা উৎখাত করার এক অসাধারণ সক্ষমতা রয়েছে, যা প্রায় ঈর্ষণীয়। তবে, একইসঙ্গে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, স্বৈরাচার উৎখাত করার ক্ষেত্রে যতটা পারদর্শী, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জাতিগতভাবে আমরা ততটাই দুর্বল। দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম সম্প্রতি এই মন্তব্য করে বলেছেন, স্বৈরাচারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর গণতান্ত্রিক কাঠামোকে মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে না পারার এক অদ্ভুত অক্ষমতা আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। তার মতে, এর প্রধান কারণ প্রতিটি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে রাজনীতির মাত্রাতিরিক্ত অনুপ্রবেশ।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে তিন দিনব্যাপী 'বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬'-এর দ্বিতীয় দিনে 'আমরা কি জানি কীভাবে শাসন পরিচালনা করতে হয়?' শীর্ষক একটি পর্বে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাহফুজ আনাম। সেখানেই তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তার বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং গণতান্ত্রিক অগ্রগতির পথে অন্তরায়গুলো নিয়ে গভীর বিশ্লেষণের সুযোগ করে দিয়েছে।
মাহফুজ আনাম তার বক্তব্যের শুরুতে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতাগুলোও তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্তমান সময়ে বিশ্বে একইসঙ্গে এত যুদ্ধ আগে কখনো দেখা যায়নি। শক্তিশালী দেশগুলোর ইচ্ছামতো অন্য দেশে বোমা ফেলার প্রবণতা ছোট দেশগুলোর নাজুক পরিস্থিতিকে আরও প্রকট করে তুলছে। এমন এক সময়ে যখন গোটা বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, এল নিনোর প্রভাব প্রশমন এবং সমুদ্রের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য আরও বেশি সম্পদ ব্যয় করা জরুরি, তখন বিশ্ব সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করছে মারণাস্ত্রের পেছনে। এই পরিস্থিতি সার্বভৌমত্বের ধারণাকে অস্ত্রের মজুত ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে একীভূত করে ফেলেছে, যা তার মতে আত্মঘাতী।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ফিরে এসে মাহফুজ আনাম বলেন, এক নৃশংস সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই দেশের জন্ম হলেও, এখানে একটি কার্যকর গণতন্ত্র এখনো গড়ে তোলা যায়নি। তিনি ১৯৯১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পতন এবং পরবর্তীতে গণতন্ত্রে ফেরার অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে দেন। সেসময় জাতি সত্যিই আশা করেছিল যে, এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম ঘটবে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একাধিক নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পরিবর্তে আমরা ক্রমেই সংঘাত ও ধ্বংসের দিকে এগিয়েছি, যা জাতির জন্য এক বড় ব্যর্থতা।
তিনি মনে করেন, এই ব্যর্থতার কারণ হলো আমরা আসলে জানি না কীভাবে একটি দেশ পরিচালনা করতে হয়, বা শাসনব্যবস্থা কী। আমরা জানি না কীভাবে মানুষের সব শক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং সহনশীলতাকে একত্রিত করে সেই সম্পদকে জাতীয় উন্নয়নে রূপান্তর করতে হয়। ডেইলি স্টার সম্পাদক এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, স্বৈরাচার উৎখাতের সময় জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়, কিন্তু স্বৈরাচার উৎখাত হয়ে যাওয়ার পর জাতি দ্রুতই বিভক্ত হয়ে পড়ে। যে গোষ্ঠীগুলো স্বৈরাচার উৎখাতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছিল, তারাই পরে একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়। এখানেই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে আমরা বারবার ব্যর্থ হয়েছি।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বারবার ব্যর্থতার মূল কারণ হিসেবে মাহফুজ আনাম প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত রাজনীতিকরণকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, দেশে চিকিৎসকেরাও রাজনৈতিক দলের সমর্থনের ভিত্তিতে বিভক্ত। সাংবাদিকতা পেশাও এর ব্যতিক্রম নয়; এখানে কেউ বিএনপিপন্থী, কেউ আওয়ামী লীগপন্থী, আবার কেউ জামায়াতপন্থী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু একজন সাংবাদিক কীভাবে একই সঙ্গে কোনো দলপন্থী হতে পারেন, যেখানে বিশ্বাসযোগ্যতাই তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ? ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পছন্দ থাকতেই পারে এবং ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতাও আছে, কিন্তু পেশাদারিত্বের জায়গায় প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ নিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ণ রাখার আশা করা যায় না।
আমলাতন্ত্র, পুলিশ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি দেশের সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতেও রাজনীতির এই গভীর প্রভাব তাদের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যখন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারে না, তখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জনগণের আস্থা হারায়। এই অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ কেবল পেশাদারিত্বকেই নষ্ট করে না, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মেরুদণ্ড ভেঙে দেয় এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ করে।