আসন্ন দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনে দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের সজাগ থাকার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কোনো মহল যাতে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পাশাপাশি পূজামণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালনেরও আহ্বান জানানো হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন দলের চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যেখানে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন দুর্গাপূজায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় থাকাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অপশক্তি যাতে কোনোভাবেই সমাজে বিভেদ বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে দলের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকতে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, স্থানীয় পূজা উদ্যাপন কমিটির সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় সাধন করে বিএনপির নেতা-কর্মীরা পূজামণ্ডপগুলোতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন। সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একটি দুর্গাপূজা পর্যবেক্ষণ কমিটিও গঠন করা হয়েছে, যা পূজার দিনগুলোতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করবে।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি জানান, বৈঠকে মূল আলোচনার বিষয় ছিল কীভাবে আসন্ন দুর্গাপূজা আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করা যায়। রিজভী একটি নির্দিষ্ট মহলের বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, এই মহলটি দেশের এবং গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে নানামুখী অপপ্রচার, অপকীর্তি ও চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, সরকার তার দক্ষ ব্যবস্থাপনায় সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম। দলের নেতা-কর্মীদের এই ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সর্বদা সজাগ ও সক্রিয় থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
দুর্গাপূজা সংক্রান্ত আলোচনার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বৈঠকে গভীর আলোচনা হয়। বিশেষ করে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিতে নেতারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে আসা দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরেন। বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে সাধারণ মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে কার্যকর নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়। এছাড়াও, দেশের ব্যাংকিং খাত এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিভিন্ন উপায় ও কৌশল নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হয়।
সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়, যা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অপরিহার্য। যুবসমাজকে মাদকের ভয়ংকর ঝুঁকি থেকে রক্ষায় মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করে আরও কঠোর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান দলের শীর্ষ নেতারা। তারা মনে করেন, একটি সুস্থ ও কর্মঠ যুবসমাজই দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে মূল শক্তি, তাই মাদকাসক্তি থেকে তাদের রক্ষা করা জাতীয় কর্তব্য।
জাতীয় স্থায়ী কমিটির এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, রুহুল কবির রিজভী, ফরহাদ হালিম ডোনার, ইসমাঈল জবিউল্লাহ, আমানউল্লাহ আমানসহ দলের অন্যান্য প্রবীণ ও গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। তাদের উপস্থিতিতে এই বৈঠক দেশের চলমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিস্তৃত ও ফলপ্রসূ আলোচনার মঞ্চ তৈরি করে।
বিএনপির এই নির্দেশনা ও আলোচনাগুলি দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের এই উদ্যোগ দেশের মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি দেওয়া এই বার্তাগুলি প্রমাণ করে যে বিএনপি দেশের সার্বিক কল্যাণ ও স্থিতিশীলতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।