ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নতুন এক রেকর্ড গড়েছেন বায়ার্ন মিউনিখের ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন। ৩০ বছর বয়স পেরিয়ে এই টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় তিনি পেছনে ফেলেছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি লিওনেল মেসিকে। গতকাল রাতে নরওয়ের ক্লাব ভাইকিংয়ের বিপক্ষে বায়ার্ন মিউনিখের রোমাঞ্চকর ৩-৩ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে জোড়া গোল করে কেইন এই ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেন। যদিও তার দল জয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারেনি, ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাতায় তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে।
নরওয়ের ভাইকিং স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচে কেইনের জোড়া গোল কেবল তার দলের পয়েন্ট নিশ্চিত করেনি, বরং চ্যাম্পিয়ন্স লিগের পরিসংখ্যানের এক বিশেষ অধ্যায়ে তাকে মেসির চেয়েও এগিয়ে দিয়েছে। ৩৩ বছর বয়সী এই ইংলিশ তারকা ৩০ বছর বয়স অতিক্রম করার পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এখন পর্যন্ত ৪০ ম্যাচে ৩৬টি গোল করেছেন। অন্যদিকে, লিওনেল মেসি ৩০ পেরোনোর পর এই টুর্নামেন্টে ৪৮টি ম্যাচ খেলে ৩৫টি গোল করেছিলেন। অর্থাৎ, ভাইকিংয়ের জালে কেইনের দ্বিতীয় গোলটিই তাকে বার্সেলোনার কিংবদন্তিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়, যা ফুটবল বিশ্বে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
২০২৩ সালে টটেনহ্যাম হটস্পার ছেড়ে বুন্দেসলিগার জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেওয়ার পর থেকেই হ্যারি কেইনকে এক ভিন্ন রূপে দেখা যাচ্ছে। বায়ার্নের আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ইউরোপ সেরার মঞ্চে নিজের গোলক্ষুধা আরও বাড়িয়ে তুলেছেন। জার্মানিতে আসার পর থেকেই তার গোল করার ধারাবাহিকতা চোখে পড়ার মতো, যা তাকে দ্রুতই এই বিশেষ রেকর্ডের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তার এই ফর্ম কেবল ক্লাব ফুটবলেই নয়, জাতীয় দল ইংল্যান্ডের হয়েও তাকে আরও ধারালো করে তুলেছে, যা তাকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মেসিকে পেছনে ফেলার পর কেইনের সামনে এখন রয়েছেন আরও তিন কিংবদন্তি – করিম বেনজেমা, রবার্ট লেভানডফস্কি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ৩০ বছর বয়স পেরিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গোল করার এই তালিকায় বেনজেমার গোলসংখ্যা ৩৭টি, লেভানডফস্কির ৬৪টি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ৬৮টি। কেইন যে গতিতে ছুটছেন, তাতে করিম বেনজেমাকে পেছনে ফেলা তার জন্য স্রেফ সময়ের ব্যাপার বলেই মনে করছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। তবে লেভানডফস্কি ও রোনালদোর মতো তারকাদের টপকে যেতে পারবেন কিনা, তা জানতে হলে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টানা গোল করার ক্ষেত্রেও হ্যারি কেইন নিজের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন। এই নিয়ে তিনি টানা ৯টি ম্যাচে গোল করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন, যা তাকে পোলিশ কিংবদন্তি রবার্ট লেভানডফস্কি এবং সাবেক ডাচ স্ট্রাইকার রুড ফন নিস্টলরয়ের পাশে বসিয়েছে। এই দুই তারকাও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টানা ৯ ম্যাচে গোল করার রেকর্ড গড়েছিলেন। তবে সার্বিক রেকর্ড গড়তে কেইনকে আরও তিনটি ম্যাচে গোল করতে হবে, কারণ ২০১৮ সালে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো টানা ১১টি ম্যাচে গোল করে এই রেকর্ড নিজের নামে করেছিলেন, যা এখনও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাশাপাশি, হ্যারি কেইন এবার ব্যালন ডি’অর জয়ের অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। গত মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন তিনি। ৬৫টি ম্যাচে মোট ৭৩টি গোল করে তিনি ফুটবল বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। এর পাশাপাশি, বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে বুন্দেসলিগা জয়ের স্বাদ উপভোগ করেছেন এবং জার্মান কাপও জিতেছেন। গত জুলাইয়ে শেষ হওয়া বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালে তুলে নিয়েছিলেন তার নেতৃত্বগুণ ও গোল করার সক্ষমতা।
বর্তমান মৌসুমেও হ্যারি কেইন তার দুর্দান্ত ফর্ম অব্যাহত রেখেছেন। এখন পর্যন্ত ৯টি ম্যাচে তিনি ৮টি গোল করেছেন, যা তার গোলক্ষুধা এবং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। তার এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে শুধু রেকর্ডের বইয়ে স্থান দিচ্ছে না, বরং বায়ার্ন মিউনিখ এবং ইংল্যান্ড জাতীয় দলের সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি হিসেবেও তাকে তুলে ধরছে। কেইনের সামনে এখন আরও অনেক রেকর্ড ভাঙার সুযোগ রয়েছে এবং তার লক্ষ্য যে কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং দলের জন্য ট্রফি জেতা, তা তার খেলাতেই স্পষ্ট।