শুক্রবার, 2 অক্টোবর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠী: অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে নীতি ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহায়ক সমাজ গঠনের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জনমিতিক পরিবর্তনের সাথে প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অধিকার নিশ্চিতকরণে নীতি ও বাস্তবায়নের ফারাক মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠী: অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে নীতি ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

প্রতি বছর ১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত হয়, যা প্রবীণদের প্রতি সম্মান জানানোর পাশাপাশি জনসংখ্যার বার্ধক্যজনিত সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই দিবসটি প্রবীণদের মর্যাদা, অধিকার, স্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিত ও উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯০ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, দ্রুত পরিবর্তনশীল জনমিতিক কাঠামোর আলোকে এই দিবসটি দীর্ঘায়ু, সুস্থ বার্ধক্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আন্তঃপ্রজন্মীয় সংহতি নিয়ে নতুনভাবে ভাবার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রবীণদের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সহায়ক একটি সমাজ গঠন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের জনমিতিক কাঠামোতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত দুই দশকে ষাটের ঊর্ধ্বে জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০০১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা ছিল ৭০ লক্ষ ৭৩ হাজার, যা ২০২২ সালের জনশুমারীতে বেড়ে ১ কোটি ৫৩ লক্ষাধিক হয়েছে। একইভাবে, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী জনগোষ্ঠী ২০১১ সালের ৬৮ লক্ষ ৬৫ হাজার থেকে ২০২২ সালে প্রায় ১ কোটিতে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ (২০২৪) অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এই সংখ্যা ১ কোটি ২১ লক্ষাধিক এবং ২০৪০ সালে প্রায় ২ কোটিতে পৌঁছাবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২ কোটি হবে, যা ২০৫০ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে ৪ কোটিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

এই জনমিতিক পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ হলো জন্ম ও মৃত্যুহার হ্রাস, যা বয়স কাঠামোর পরিবর্তন ঘটিয়েছে। মানুষের গড় জীবন আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি এবং প্রজননহার হ্রাস পাওয়ায় প্রবীণদের সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে জন্মকালে গড় জীবন আয়ুষ্কাল ৭৫ বছরে উন্নীত হয়েছে, যেখানে নারীরা ৭৭ বছর বাঁচেন, যা পুরুষের তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন বছর বেশি। এর ফলে ভবিষ্যতে বয়স্ক নারীর সংখ্যা আনুপাতিক হারে পুরুষের তুলনায় বেশি থাকবে। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায়, যার প্রতিবেদন ২০২২ সালের জুন মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস সেন্সাস ব্যুরো প্রকাশ করে, দেখা গেছে যে ২০৬০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পৃথিবীর শীর্ষ ১০টি প্রবীণ জনগোষ্ঠীর দেশের একটি হবে এবং ৭ম অবস্থানে থাকবে।

প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতে জাতীয় বাজেট বা অর্থ বরাদ্দ যথাযথ হারে হচ্ছে কিনা, তা একটি বড় প্রশ্ন। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বয়স্ক ভাতা কার্যক্রমের সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১ লক্ষ বৃদ্ধি করে ৬২ লক্ষ এবং ভাতার হার ৫০ টাকা বৃদ্ধি করে ৭০০ টাকা করার প্রস্তাব করেছেন। তবে এই প্রস্তাব প্রবীণ জনমিতির সঠিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে হয়েছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে যে বয়স্ক ভাতা প্রদান করা হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। সরকার ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে এবং অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীও অব্যাহত রাখার কথা বলেছে, যা ইতিবাচক পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের সংবিধানে প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের ১৫ (ঘ) অনুচ্ছেদে বার্ধক্য পরিস্থিতিতে সামাজিক নিরাপত্তার অধিকারের কথা উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও, জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩ এবং পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩ প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস হওয়া দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (সংশোধন) বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে বাবা-মা ও প্রবীণদের সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এই সকল নীতিমালা এবং আইন প্রবীণদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হলেও, এর বাস্তবায়নে এখনও অনেক ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়।

বিশেষ করে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত দিকগুলোতে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩-এর ১২ অনুচ্ছেদে প্রবীণদের স্বাস্থ্য সেবার বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এতে প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতালে জেরিয়াট্রিক বিভাগ থাকা, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে পৃথক কাউন্টার ও ওয়ার্ড স্থাপন এবং প্রত্যেক হাসপাতালে কমপক্ষে ৫ শতাংশ সিট প্রবীণ ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষণ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু নীতিমালা প্রণয়নের এক যুগ পরেও প্রশ্ন ওঠে, এই বিধানগুলো কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে এবং প্রবীণরা কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন কিনা। এই বাস্তবায়ন ঘাটতি প্রবীণদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে।

জাতিসংঘ ঘোষিত সুস্থ বার্ধক্যের দশক (২০২১–২০৩০), যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে, এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের যথেষ্ট প্রাসঙ্গিকতা ও যুক্তিযুক্ততা রয়েছে। বাংলাদেশের মতো দ্রুত বার্ধক্যপ্রবণ সমাজের জন্য প্রবীণদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, এবং স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। শুধু আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, বরং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রবীণদের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মর্যাদাশীল ও সহায়ক সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই হবে এই দিবসের মূল সার্থকতা। এ বিষয়ে সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং সমাজের প্রতিটি স্তরের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ