রবিবার, 27 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা

দক্ষিণ কোরিয়ায় ‘আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাওয়ার্ড’ জিতে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করলেন জাবীর জারিফ আখতার

দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত কোরিয়া আন্তর্জাতিক পানি সপ্তাহ ২০২৬-এর ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াটার চ্যালেঞ্জ’ পর্বে ‘আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাওয়ার্ড’ জিতে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন ১৯ বছর বয়সী তরুণ গবেষক জাবীর জারিফ আখতার। তার উদ্ভাবিত ‘আরবানসেন্টিনেল’ প্রযুক্তি শহুরে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার দূষণ শনাক্তে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

শেয়ার করুন:
দক্ষিণ কোরিয়ায় ‘আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাওয়ার্ড’ জিতে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করলেন জাবীর জারিফ আখতার

দক্ষিণ কোরিয়ার দেগুতে গত ৯ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ‘কোরিয়া আন্তর্জাতিক পানি সপ্তাহ ২০২৬ (কেআইডব্লিউডব্লিউ)’ আয়োজনে বাংলাদেশের জাবীর জারিফ আখতার অর্জন করেছেন ‘আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাওয়ার্ড’। কোরিয়া ওয়াটার ফোরাম এবং দেশটির জলবায়ু, জ্বালানি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশাল সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ১২ হাজার গবেষক, সরকারি প্রতিনিধি, বিভিন্ন সংস্থার কর্মী ও পানিসম্পদ খাতে নিয়োজিত পেশাজীবী অংশ নিয়েছিলেন। এবারের আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘পানি, শক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: আমাদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা’, যা বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতি আলোকপাত করে।

এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াটার চ্যালেঞ্জ’, যেখানে বিশ্বের পানিসংক্রান্ত জটিল সমস্যাগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান উপস্থাপন করা হয়। বহু আবেদনপত্রের মধ্য থেকে চূড়ান্ত পর্বে মাত্র আটটি দলকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এই আটটি দলের মধ্যে থেকে দুটি দলকে ‘আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়, যার একটিতে ছিলেন বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৯ বছর বয়সী জাবীর জারিফ আখতার। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ‘দল’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও জারিফই ছিলেন তার দলের একমাত্র সদস্য, যা তার এই অর্জনকে আরও মহিমান্বিত করেছে। কেআইডব্লিউডব্লিউর ওয়েবসাইট অনুযায়ী, অপর বিজয়ী দলে ছিল ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের প্রতিনিধিরা।

জারিফ তার উদ্ভাবনী প্রকল্প ‘আরবানসেন্টিনেল’ বা ‘নগরপ্রহরী’ উপস্থাপনের মাধ্যমে এই সম্মানজনক পুরস্কার অর্জন করেন। এই প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে শহুরে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার দূষণ দ্রুত শনাক্ত করা, দূষণের উৎস চিহ্নিত করা এবং কার্যকরভাবে তা শোধন করার একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি তুলে ধরা। তার উপস্থাপনায় ডিপ লার্নিং প্রযুক্তির ব্যবহার দেখানো হলেও এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রচলিত মডেলগুলোর মতো কোনো দূরবর্তী বৃহৎ সার্ভারের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং, সম্পূর্ণ প্রোগ্রাম এবং মেশিন লার্নিং মডেলটি ডিভাইসের ভেতরেই সমন্বিত থাকে, যা এর কার্যকারিতাকে আরও সুদৃঢ় ও স্বাধীন করে তোলে।

তরুণ গবেষক জারিফ তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তির ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিভিন্ন শহরে পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে তার এই প্রযুক্তি বিশেষভাবে সহায়ক হবে। এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন বন্যা, যখন পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে, তখনও নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে সক্ষম। কারণ, এই সিস্টেমটি ‘অফলাইনে’ও সম্পূর্ণ কার্যকর থাকে, যা দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে এর উপযোগিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং নিরাপদ পানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কেআইডব্লিউডব্লিউর ওয়েবসাইটে জারিফের নামের পাশে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নাম উল্লেখ করা হয়েছে। জারিফ নিজেও নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজিতে (আইএটি) গবেষণা সহকারী হিসেবে কর্মরত আছেন। এই প্রতিষ্ঠানের একজন গবেষক হিসেবেই তিনি বাছাইয়ের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াটার চ্যালেঞ্জে’ অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। এর আগেও তিনি ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ‘স্টকহোম জুনিয়র ওয়াটার প্রাইজ’-এ অংশ নিয়েছিলেন এবং একবার সেরা পাঁচের মধ্যে স্থান করে নিয়েছিলেন, যা পানি নিয়ে তার দীর্ঘদিনের গবেষণার অভিজ্ঞতারই ফল।

আন্তর্জাতিক এই সম্মাননা অর্জন প্রক্রিয়াটি মোটেও সহজ ছিল না বলে জানিয়েছেন জারিফ। তাকে বিচারকদের সামনে তার কাজের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উপস্থাপন করতে হয়েছে। নেটওয়ার্কটি কীভাবে কাজ করে, এর টেকসইতা কতটুকু, এবং শহুরে পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এটি কতটা উপযোগী – এমন নানা বিষয় যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হয়েছে। পাশাপাশি, বিচারকদের কঠিন সব প্রশ্নের অত্যন্ত সুচিন্তিত ও তথ্যবহুল উত্তর দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। জারিফের এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএটি এবং টেক্সটাইল অ্যানালিটিক্যাল ল্যাবরেটরি সার্বিক সহায়তা প্রদান করেছে। এছাড়াও, কাজটির পরীক্ষামূলক বিভিন্ন ধাপে বুয়েট এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) সক্রিয় সহযোগিতা করেছে।

জাবীর জারিফ আখতারের শিক্ষাজীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি ২০২৩ সালে বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি এবং গত বছর সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেছেন। পড়াশোনার বাইরেও তার বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়; তিনি গান শিখেছেন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা এবং স্কুল পর্যায়ে টেলিভিশন বিতর্কেও অংশ নিয়ে পুরস্কার জিতেছেন। এর আগে নাসার ‘গ্রেট লুনার এক্সপেডিশন ফর এভরিওয়ান’ মিশনের রিসার্চ অ্যান্ড টেকনোলজি লিড হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাও তার ঝুলিতে রয়েছে, যা তার প্রজ্ঞা ও মেধারই পরিচায়ক।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে জারিফ জানিয়েছেন, তিনি প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আগ্রহী। তবে তার স্বপ্ন কেবল গবেষণা বা পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান তার উদ্ভাবিত গবেষণার সুফল যেন সাধারণ মানুষ বাস্তব জীবনে ভোগ করতে পারে, সেদিকটিও নিশ্চিত করতে। তাই পড়াশোনা শেষে গবেষণার পাশাপাশি দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার মাধ্যমে তিনি সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে অবদান রাখতে চান, যা তার দূরদর্শী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটায়।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ