রাজধানীর বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্কুল পর্যায়ের বইপড়া কর্মসূচির দুই দিনব্যাপী পুরস্কার বিতরণ উৎসব উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। গ্রামীণফোনের সহযোগিতায় আয়োজিত এই বৃহৎ আয়োজনে ঢাকা মহানগরের মোট ৭১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫ হাজার ৮২৩ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত করা হয়। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এই উৎসবের সমাপনী পর্ব অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার পাশাপাশি জ্ঞানচর্চা ও ইতিবাচক জীবন গঠনে বইয়ের অপরিহার্য ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া হয়।
এই পুরস্কার বিতরণী উৎসবের বিশেষ দিক ছিল শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং ছাত্রীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। দুই দিনের আয়োজনে ঢাকা মহানগরের ৩৫টি স্কুলের ২ হাজার ৭২৯ জন শিক্ষার্থীকে ২৬ সেপ্টেম্বর, সমাপনী দিনে পুরস্কার প্রদান করা হয়। মোট ৫ হাজার ৮২৩ জন বিজয়ীর মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৮০৫ জন, যা ছাত্রদের সংখ্যার (১ হাজার ১৮ জন) চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ার পরিমাণ ও আগ্রহের ওপর ভিত্তি করে তাদের ‘শুভেচ্ছা’, ‘অভিনন্দন’ এবং ‘সেরা পাঠক’—এই তিনটি বিশেষ বিভাগে পুরস্কৃত করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট ৪ হাজার ২৮৮ জন শিক্ষার্থী ‘শুভেচ্ছা’ পুরস্কার লাভ করেছে। এছাড়া, ১ হাজার ৩৬৭ জন ‘অভিনন্দন’ এবং ১৬৮ জন শিক্ষার্থী ‘সেরা পাঠক’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই পুরস্কারগুলো কেবল একটি স্বীকৃতি নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং তাদের মেধা ও মননকে বিকশিত করার একটি শক্তিশালী অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দীর্ঘকাল ধরে এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের তরুণ প্রজন্মকে বইমুখী করে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।
অনুষ্ঠানের সকালের অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “নেতিবাচক কোনো কিছুই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে না। বইয়ের মাধ্যমে ইতিবাচক মনোভাব ধারণ করো, এটি তোমাকে এবং সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমি তোমাদের অনুরোধ করব, বেশি বেশি বই পড়ো।” তার এই বক্তব্য শিক্ষার্থীদের মনে ইতিবাচক চিন্তা ও জ্ঞানার্জনের প্রতি গভীর আগ্রহ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছে। তিনি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জীবনে বইয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে তাদের আরও বেশি করে বই পড়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে লেখক ও অভিনেতা খায়রুল আলম সবুজ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “তোমাদের এই সময়টা হলো প্রস্তুত হওয়ার, সামনে তোমাদের অনেক সমস্যা আসবে, সেগুলোর সমাধান করতে হবে। আর তা সম্ভব হবে কারণ তোমরা বই পড়ে আলোকিত মানুষ হতে পেরেছ তাই।” প্যারাগন গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি মশিউর রহমানও তার বক্তব্যে বইয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “জীবনের যে পর্যায়েই তোমরা থাকো না কেন, বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। বই মনকে বড় করে, জানার পরিধি বাড়ে, জ্ঞানের ভান্ডার বিকশিত করে, জীবনকে সমৃদ্ধ করে তোলে।” তাদের মূল্যবান পরামর্শ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
গ্রামীণফোন লিমিটেডের স্ট্র্যাটেজিক প্রোগ্রাম লিড সোহেল রানা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, “বইপড়া কর্মসূচির মাধ্যমে তোমরা যে বইগুলো পড়তে পারছ, সেগুলোর মাধ্যমে তোমরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন বই সম্পর্কে জানতে পারছ, জানার পরিধি বিস্তৃত করছে—এটি একটি অনন্য উদ্যোগ।” এছাড়া, অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ফরিদুর রেজা সাগর, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক ও কথাসাহিত্যিক আফসানা বেগম, সাবেক সচিব ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক খোন্দকার আসাদুজ্জামান এবং কেন্দ্রের উপদেষ্টা অধ্যাপক রঞ্জনা সায়ীদ প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ বক্তব্য রাখেন এবং শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন।
এবারের আয়োজনে বই পড়ার পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। প্রথমবারের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘অনলাইন সেফটি ফান্ডামেন্টালস’ শীর্ষক একটি অনলাইন সচেতনতামূলক কোর্স। এর পাশাপাশি, মিলনায়তন প্রাঙ্গণে একটি ‘অনলাইন সেফটি কর্নার’ স্থাপন করা হয়, যেখানে শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণ বিষয়ে নানা তথ্য ও পরামর্শ প্রদান করা হয়। এটি বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ রাখতে এবং তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এই বইপড়া কর্মসূচি শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস তৈরি করে না, বরং তাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটায়। এই ধরনের কার্যক্রম দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। এবারের পুরস্কার বিতরণী উৎসবের সফল পরিসমাপ্তি আবারও প্রমাণ করলো যে, বইয়ের আবেদন চিরন্তন এবং জ্ঞানার্জনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল সমাজ গঠন সম্ভব হবে।