বৃহস্পতিবার, 24 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

বাকের ভাইয়ের ফাঁসি: ৩৩ বছর পরেও ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের শেষ পর্ব ঘিরে জনউন্মাদনার স্মৃতিচারণ

বাংলাদেশের টেলিভিশনের ইতিহাসে অন্যতম সাড়া জাগানো নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’-এর শেষ পর্ব প্রচারের ৩৩ বছর পেরিয়ে গেছে। আজও সেই নাটকের প্রধান চরিত্র বাকের ভাইয়ের ফাঁসি ঘিরে দর্শকদের আবেগ, মিছিল ও গণমাধ্যমের সংবাদগুলো স্মৃতিতে অমলিন।

শেয়ার করুন:
বাকের ভাইয়ের ফাঁসি: ৩৩ বছর পরেও ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের শেষ পর্ব ঘিরে জনউন্মাদনার স্মৃতিচারণ

বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে ‘কোথাও কেউ নেই’ একটি অবিস্মরণীয় নাম, যা দর্শকদের হৃদয়ে এক গভীর ও স্থায়ী ছাপ ফেলে গেছে। আজ থেকে ৩৩ বছর আগে এর প্রচার শেষ হলেও, ভাইরালের এই যুগেও নাটকটির বিভিন্ন দৃশ্য, সংলাপ ও চরিত্রগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারবার ফিরে আসে। বিশেষ করে নাটকটির শেষ পর্ব ঘিরে দর্শকদের মধ্যে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, তা আজও এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই সময়কার গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের স্মৃতিচারণায় সেই ঐতিহাসিক দিনের চিত্র আজও জীবন্ত।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তাঁর একটি আত্মজীবনীমূলক বইতে উল্লেখ করেছেন যে, নাটকটির শেষ পর্ব ১৯৯৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রচারিত হয়েছিল। এই তথ্য অনুসারে, এই কালজয়ী নাটকটি ৩৩ বছর আগে তার যবনিকাপাত ঘটিয়েছিল। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইউটিউব চ্যানেলে নাটকটির সবকটি পর্ব আজও উপলব্ধ, যেখানে মন্তব্যের ঘরে দর্শকরা প্রতিনিয়ত তাঁদের আবেগঘন স্মৃতিচারণা করে চলেছেন। এই মন্তব্যগুলোই প্রমাণ করে যে, সময় পেরিয়ে গেলেও ‘কোথাও কেউ নেই’-এর আবেদন এতটুকুও কমেনি।

নাটকের শেষ পর্ব প্রচারের দিনটি ছিল এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। মোহাম্মদ ইমরান নামের এক দর্শক স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, তিনি তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তেন এবং এলাকার বড় ভাইদের সঙ্গে ‘বাকের ভাইয়ের মুক্তি চাই’ স্লোগানে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। এটি তাঁর জীবনের এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি, যা প্রায়শই তাঁর মনে পড়ে। নাটকটির শেষ পর্ব দেখে তিনি এতটাই কেঁদেছিলেন যে, আজও যখনই তিনি সেই পর্ব দেখেন, তাঁর অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে। টিটু নামের আরেক দর্শক তাঁর স্মৃতিতে লিখেছেন, শেষ পর্ব দেখার জন্য তাঁদের টেলিভিশন ঘরের বাইরে বের করতে হয়েছিল এবং উঠান লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়েছিল। মানুষের সেই সম্মিলিত কান্না ও আবেগ আজকের প্রজন্মের কাছে হয়তো কেবল কল্পনার বিষয়।

দর্শকদের অনেকেই মনে করেন, অতীতের নাটকগুলোতে সমাজ ও জীবনের বাস্তব চিত্র যেভাবে প্রতিফলিত হতো, আজকের নাটকে তা বিরল। ‘কোথাও কেউ নেই’ ছিল সেই বাস্তবধর্মী নাটকের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা মানুষের আবেগ-অনুভূতিকে প্রবলভাবে নাড়া দিত এবং বিবেককে জাগ্রত করত। আনসার আহমেদ নামের একজন দর্শক তাঁর শৈশবের দিনের কথা স্মরণ করে লিখেছেন, এই নাটক নিয়ে মানুষের মধ্যে এক প্রবল উন্মাদনা ছিল। ‘বাকের ভাইয়ের মুক্তি চাই’ স্লোগানে মিছিল হওয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত এটিই একমাত্র নাটক, যা প্রমাণ করে নাটকটি কতটা জীবন ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল এবং সমাজকে কতটা আন্দোলিত করেছিল।

৩৩ বছর আগে নাটকের শেষ পর্ব ঘিরে গণমাধ্যমেও ব্যাপক খবর প্রকাশিত হয়েছিল। একটি গণমাধ্যমে নাটকটি ঘিরে শিরোনাম ছিল, ‘আজ বাকেরের ফাঁসি’। সেই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, ‘আজ বাকেরের ফাঁসি হবে। ফাঁসির আসামী বাকের ওরফে আসাদুজ্জামান নূর অবশ্য নির্বিকার। গতকাল সোমবার রাতে টেলিফোনে তিনি জানিয়েছেন, “আমার কোনো প্রতিক্রিয়া নাই। কারণ আগে থেকেই জানা ছিল ঘটনাটি।”’ সেই সময়ে আসাদুজ্জামান নূর আরও জানান, দর্শকভক্তদের ফোন পেয়ে তিনি রীতিমতো হয়রান হয়েছেন। বিটিভির জনপ্রিয় নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’-এর শেষ পর্ব প্রচারিত হবে সেদিন। হুমায়ূন আহমেদ রচিত এবং বরকতউল্লাহ প্রযোজিত নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র বাকের, যার মিথ্যা খুনের দায়ে শেষ পর্বে ফাঁসি হবে।

সেই সময়ের গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শেষ পর্যন্ত বাকেরের ফাঁসি হবে না—এমন গুজব গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর বেশ কিছু জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে রাতে ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের সম্পাদনায় ব্যস্ত প্রযোজক বরকতউল্লাহ ফোনে নিশ্চিত করেন, ‘ফাঁসি মাস্ট’। তবে একই সঙ্গে তিনি এও উল্লেখ করেন যে, সেদিন প্রচারিত নাটকের শেষ পর্বেও চমক থাকবে, যা দর্শকদের যেকোনো ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখিয়েছিল। নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তখন পাওয়া যায়নি, যা নাটক ঘিরে রহস্য আরও বাড়িয়েছিল। এমন বহু খবরের খণ্ড অংশ সেই সময় ভক্তরা যত্ন করে সংগ্রহ করে রেখেছিলেন, যা আজও তাঁদের কাছে অমূল্য স্মৃতি।

‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের গল্প আবর্তিত হয়েছিল মহল্লার মাস্তান বাকের ভাইকে ঘিরে, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন। কিন্তু এক হত্যাকাণ্ডে তাঁকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়। সাজানো সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়। বাকেরকে বাঁচাতে মুনাসহ অনেকেই প্রাণপণ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ফাঁসি ঠেকানো যায়নি। বাকেরের মৃত্যুর পর মুনার একাকিত্বেই শেষ হয় হুমায়ূন আহমেদের এই কালজয়ী নাটক। নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন আসাদুজ্জামান নূর, সুবর্ণা মুস্তাফা, আবদুল কাদের, লুৎফর রহমান জর্জ, মাহফুজ আহমেদ, আফসানা মিমি এবং কিংবদন্তী অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি। এই নাটকটি কেবল একটি টেলিভিশন প্রোগ্রাম ছিল না, এটি ছিল একটি গণআবেগ, যা আজও বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ