বৃহস্পতিবার, 1 অক্টোবর 2026
⚠ ব্রেকিং
সংগীত 🇧🇩 বাংলা

শাটল ট্রেন থেকে জাতীয় মঞ্চে: আলোচিত ব্যান্ড তীরন্দাজের দীর্ঘ ১৮ বছরের সংগ্রামী পথচলা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনের কোলাহল থেকে শুরু হয়ে দেশের বিভিন্ন মঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে ব্যান্ড ‘তীরন্দাজ’। দীর্ঘ ১৮ বছরের এই যাত্রাপথে তারা পার করেছে অসংখ্য চড়াই-উতরাই, অর্জন করেছে জাতীয় পরিচিতি এবং তৈরি করেছে নিজস্ব মৌলিক গানের ভান্ডার।

শেয়ার করুন:
শাটল ট্রেন থেকে জাতীয় মঞ্চে: আলোচিত ব্যান্ড তীরন্দাজের দীর্ঘ ১৮ বছরের সংগ্রামী পথচলা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনের নিত্যদিনের শব্দের সঙ্গে একসময় মিশে যেত একদল তরুণের উদ্দীপ্ত সুর। ২০০৭ সালে এমনই এক প্রেক্ষাপটে শান শাহেদ নামের এক স্বপ্নবাজ তরুণের মনে জন্ম নেয় একটি ব্যান্ড গড়ার ভাবনা। বন্ধুদের নিয়ে শুরু হয় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথচলা, যার ফলস্বরূপ পরের বছর, অর্থাৎ ২০০৮ সালে আত্মপ্রকাশ করে ‘তীরন্দাজ’। এই ব্যান্ডটি তাদের সংগীতের মাধ্যমে কেবল চট্টগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র দেশের শ্রোতাদের মন জয় করেছে, যা তাদের দীর্ঘ ১৮ বছরের সংগ্রামী যাত্রার ফল।

শুরুর দিকে ব্যান্ডটিতে শান শাহেদ ড্রামার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন, যেখানে ভোকাল ছিলেন রাহাত। এছাড়াও জুনায়েদ ড্রামে, মিথুন গিটারে, কপিল বড়ুয়া বেজ গিটারে এবং জিতু কিবোর্ড ও ভোকাল হিসেবে ব্যান্ডের সদস্য ছিলেন। কিন্তু ২০০৮ সালের শেষ দিকে ব্যক্তিগত কারণে রাহাত, জুনায়েদ ও মিথুন ব্যান্ড ছেড়ে গেলে শান শাহেদ ভোকালের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই পরিবর্তনগুলো তীরন্দাজের যাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করে এবং তাদের ভবিষ্যতের পথ খুলে দেয়।

তীরন্দাজের পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মূলত ‘অন্ধকার ঘরে’ গানটির মাধ্যমে। ২০১০-১১ সালের দিকে যখন দেশে ফেসবুক সবেমাত্র জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে এবং স্মার্টফোনের ব্যবহার সীমিত, তখনও এই গানটি ফোন থেকে ফোনে এবং ফেসবুকের মাধ্যমে অভাবনীয় গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এই গানটিকে ঘিরে একটি ভুল গল্পও প্রচলিত হয়েছিল যে, গানটির লেখক এটি লেখার পর আত্মহত্যা করেছেন; যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হলেও, ততদিনে গানটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। ‘নিকষ কালো এই আঁধারে, স্মৃতিরা সব খেলা করে, রয় শুধু নির্জনতা, নির্জনতায় আমি একা’—১৯৯৬ সালে পেপার রাইম-এর এই গানটিকে তীরন্দাজ নিজেদের মতো করে রক ফিউশন যোগ করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়, যা তাদের জন্য এক টার্নিং পয়েন্ট ছিল।

এই গানের সাফল্যের পর চট্টগ্রামের সংগীতাঙ্গনে তীরন্দাজের পরিচিতি লাফিয়ে বাড়তে থাকে এবং বিভিন্ন মঞ্চে তাদের ডাক পড়তে শুরু করে। শান শাহেদের হিসাব অনুযায়ী, ব্যান্ডটি এ পর্যন্ত ৫০০টিরও বেশি মঞ্চ অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেছে। চট্টগ্রামের বাইরে ঢাকা ও সিলেটে তারা সর্বাধিক সংখ্যক অনুষ্ঠান করেছে। ২০১৪ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত চ্যানেল আইয়ের ব্যান্ড উৎসবে তারা টানা সাতবার পারফর্ম করে নিজেদের জাতীয় স্তরে সুপ্রতিষ্ঠিত করে, যা তাদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও প্রতিভার স্বীকৃতি।

দীর্ঘ ১৮ বছরের এই যাত্রাপথে তীরন্দাজকে অসংখ্য চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে। পেশাগত জীবন এবং সংগীতের মতো দুটি ভিন্ন ক্ষেত্রকে একসঙ্গে সামলে চলা ব্যান্ড সদস্যদের জন্য কখনও সহজ ছিল না। চট্টগ্রাম থেকে জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করা ছিল আরও বড় এক চ্যালেঞ্জ। গণমাধ্যমে উপস্থিতি, যোগাযোগ স্থাপন এবং সুযোগের দিক থেকে চট্টগ্রাম থেকে কাজ করা তাদের জন্য বাড়তি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল। এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, তীরন্দাজ চট্টগ্রাম থেকেই নিজেদের জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গেছে এবং বর্তমানে তারা বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশন (বামবা)-এর সদস্যপদও অর্জন করেছে, যা তাদের পেশাদারিত্বের পরিচায়ক।

তীরন্দাজের মঞ্চজীবনের স্মরণীয় অধ্যায়ের সঙ্গে কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চট্টগ্রামে আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে শান শাহেদ একাধিকবার একই মঞ্চে গান পরিবেশন করেছেন। এলআরবির ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানেও আইয়ুব বাচ্চু স্বয়ং শান শাহেদকে ‘ঘুমন্ত শহর’ গানটি গাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, যা শান শাহেদের জন্য ছিল এক বিশাল সম্মান। ২০১৩ সালে ‘রেড রক ফিয়েস্তা’ নামে একটি বৃহৎ আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়, যা ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ মিলনায়তনে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে প্রায় ৩৬টি ব্যান্ড অংশ নেয়। ২০১৭ সালে নতুন আঙ্গিকে এই আয়োজন পুনরায় শুরু হয় এবং ২০১৮ সালের আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তবে অনুষ্ঠানটির প্রায় এক মাস আগে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু ব্যান্ড সদস্যদের জন্য এক গভীর শোকের কারণ হয়।

দীর্ঘ এই পথে তীরন্দাজ তাদের কিছু প্রিয় সদস্য ও ঘনিষ্ঠ মানুষকেও হারিয়েছে। ২০০৯ সালে ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য কপিল বড়ুয়াকে এক মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায় হারায় তারা, যখন তিনি বান্দরবানে চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষা সফরে ছিলেন। এরপর ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট আরেকটি দুঃসংবাদ আসে; হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তীরন্দাজের ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ আলম চৌধুরী। এই শোকগুলো ব্যান্ড সদস্যদের এতটাই বিচলিত করেছিল যে, কিছু সময়ের জন্য তারা অনুষ্ঠান করাও বন্ধ রেখেছিল, যা তাদের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যান্ডের সদস্যও পরিবর্তিত হয়েছে। কেউ সংগীত ছেড়ে দিয়েছেন, কেউ বা পেশাগত ব্যস্ততার কারণে সরে গেছেন। শিক্ষাজীবনে গড়ে ওঠা এই ব্যান্ডের সদস্যরা যখন পেশাজীবনে প্রবেশ করেন, তখন সংগীতের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার সঙ্গে অন্যান্য দায়িত্বের সমন্বয় করতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের মৌলিক গান তৈরির কাজ কখনও থেমে থাকেনি। ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘পাগলাটে গান’, যা ব্যান্ডের সাবেক সদস্য বাহারের লেখা ছিল এবং এটি ছিল তীরন্দাজের প্রথম মৌলিক গান। এভাবে ধীরে ধীরে নিজেদের মৌলিক গান নিয়েও তারা একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করে। ব্যান্ডটির মোট ১৩টি মৌলিক গান রয়েছে, যার মধ্যে ৯টি রেকর্ড করা হয়েছে। ‘কষ্ট’ ও ‘স্তব্ধ পৃথিবী’ নামের দুটি গান মিশ্র অ্যালবামে স্থান পেয়েছে। বর্তমানে তীরন্দাজ তাদের নিজস্ব অ্যালবাম ‘জাগো বাংলাদেশ’ নিয়েও কাজ করছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনে যে গানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ চট্টগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন মঞ্চে ছড়িয়ে পড়েছে এবং শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে, যা তাদের অবিরাম সাধনারই ফল।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ