আকাশ বাণী ডেস্ক: মানবজাতির প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের এক অমীমাংসিত গাণিতিক রহস্য, যা ইতিহাসে 'ফার্মার শেষ উপপাদ্য' নামে পরিচিত, মাত্র ১১ দিনের মধ্যে সমাধান করে প্রযুক্তি জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। ১৭শ শতাব্দীর ফরাসি গণিতবিদ পিয়েরে দ্য ফার্মার এই জটিল ধাঁধা সমাধানের জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের বাঘা বাঘা গণিতবিদরা নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, যেখানে এআই এজেন্ট অভাবনীয় গতিতে তার বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে। এই দ্রুত সমাধান কেবল প্রযুক্তির সক্ষমতাই নয়, বরং গণিত ও বিজ্ঞান গবেষণার ভবিষ্যৎ পথও নির্দেশ করছে।
১৬৩৭ সালের প্রেক্ষাপটে, ফ্রান্সের শৌখিন গণিতবিদ ও বিচারক পিয়েরে দ্য ফার্মা তার প্রিয় গ্রিক গণিতবিদ ডায়োফ্যান্টাসের 'অ্যারিথমেটিকা' বইটি পড়ছিলেন। বইয়ের মার্জিনে তিনি একটি ছোট্ট নোট লিখেন, যেখানে একটি সমীকরণের কথা উল্লেখ করে দাবি করেন যে তিনি এর 'চমৎকার একটি প্রমাণ' খুঁজে পেয়েছেন। তবে, সেই প্রমাণের বিস্তারিত লেখার জন্য বইয়ের মার্জিনে পর্যাপ্ত জায়গা নেই বলে তিনি জানান। ফার্মার এই আপাত নিরীহ মন্তব্যই পরবর্তী সাড়ে তিনশ বছর ধরে গণিতবিদদের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ এবং ইতিহাসের অন্যতম সেরা 'রসিকতা' হয়ে দাঁড়ায়, যার সমাধানে অসংখ্য মানুষের জীবন-যৌবন উৎসর্গিত হয়।
স্কুলের পাঠ্যক্রমে আমরা অনেকেই পিথাগোরাসের উপপাদ্য সম্পর্কে জেনেছি, যা সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজ ও অপর দুই বাহুর সম্পর্কের সূত্র: a² + b² = c²। এই সূত্র অনুযায়ী, এমন কিছু পূর্ণসংখ্যা রয়েছে (যেমন ৩, ৪, ৫), যাদের দুটির বর্গের যোগফল তৃতীয়টির বর্গের সমান (৩² + ৪² = ৯ + ১৬ = ২৫ = ৫²)। এগুলোকে 'পিথাগোরিয়ান ট্রিপল' বলা হয়। পিয়েরে দ্য ফার্মা তার নোটটিতে লিখেছিলেন যে, যদি এই বর্গের জায়গায়, অর্থাৎ পাওয়ার ২-এর পরিবর্তে ২-এর চেয়ে বড় যেকোনো পূর্ণসংখ্যা (n) বসানো হয়, তবে aⁿ + bⁿ = cⁿ সমীকরণটি আর কখনো পূর্ণসংখ্যার সমাধান দেবে না। শুনতে সহজ মনে হলেও, এই 'ডালভাত' প্রমাণ করতে গিয়েই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গণিতবিদদের দাঁত ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও ফার্মার শেষ উপপাদ্য অমীমাংসিতই থেকে যায়। অবশেষে ১৯৮৬ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যান্ড্রু ওয়াইলস এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। ছোটবেলায় লাইব্রেরিতে এই ধাঁধার কথা পড়ে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং এর সমাধানে নিজেকে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নেন। লোকচক্ষুর আড়ালে, নিজের বাড়ির চিলেকোঠায় টানা সাত বছর ধরে তিনি বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু এই একটি সমীকরণ নিয়ে গবেষণা করেন। ১৯৯৩ সালে যখন তিনি ঘোষণা দেন যে তিনি ফার্মার উপপাদ্য প্রমাণ করে ফেলেছেন, তখন পুরো বিশ্বে যেন এক বোমা ফাটে। তবে, গণিতের দুনিয়া বড়ই নির্মম; প্রমাণ মানেই নিখুঁত যুক্তি ও নির্ভুলতার এক বিশাল ইমারত।
ওয়াইলসের প্রায় ১০০ পৃষ্ঠার সেই প্রমাণ পরীক্ষা করতে গিয়ে অন্য গণিতবিদেরা প্রমাণের মাঝখানে একটি ছোট্ট ভুল ধরে ফেলেন। সেই এক ভুলের কারণে তার পুরো পরিশ্রমই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। অন্য কেউ হলে হয়তো হাল ছেড়ে দিতেন, কিন্তু ওয়াইলস ছিলেন অদম্য। নিজের সহযোগী রিচার্ড টেইলরকে সঙ্গে নিয়ে তিনি আরও এক বছর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ১৯৯৪ সালে সেই ভুল শুধরে ফেলেন। অবশেষে, ১৯৯৫ সালে ফার্মার শেষ উপপাদ্য চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়। দীর্ঘ ৩৫০ বছরের সেই 'অভিশাপ' থেকে মানবজাতি মুক্তি পায়, যা গণিতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়।
মানুষের যেখানে শেষ, এআইয়ের সেখানে শুরু—এই প্রবাদটি যেন ফার্মার শেষ উপপাদ্যের ক্ষেত্রে নতুনভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। যখন মানবজাতি দীর্ঘ সাধনার পর ১৯৯৫ সালে এই উপপাদ্য প্রমাণ করতে সক্ষম হলো, তখন আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মাত্র ১১ দিনে সেই একই সমাধান বের করে দেখিয়েছে। এটি কেবল গতির পার্থক্য নয়, বরং সমস্যা সমাধানের পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এআই এজেন্টরা বিশাল ডেটা সেট বিশ্লেষণ, প্যাটার্ন শনাক্তকরণ এবং জটিল অ্যালগরিদম প্রয়োগের মাধ্যমে এমন সমাধান খুঁজে বের করতে সক্ষম হচ্ছে, যা মানুষের জন্য সময়সাপেক্ষ এবং শ্রমসাধ্য। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, এআই শুধুমাত্র পুনরাবৃত্তিমূলক কাজই নয়, বরং গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জেও মানুষের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগান্তকারী সাফল্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, মহাকাশ গবেষণাসহ বিভিন্ন জটিল বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এআইয়ের প্রয়োগ নতুন নতুন আবিষ্কারকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এটি গবেষকদের জন্য সময় ও শ্রম বাঁচিয়ে আরও গভীরতর জিজ্ঞাসার দিকে মনোযোগ দিতে সহায়তা করবে। ফার্মার শেষ উপপাদ্যের মতো ঐতিহাসিক সমস্যা দ্রুত সমাধানে এআইয়ের দক্ষতা প্রমাণ করে যে, ভবিষ্যতে আমরা এমন অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের সমাধান এআইয়ের মাধ্যমেই দেখতে পাব, যা মানব জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং সভ্যতার অগ্রগতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। এই অর্জন নিঃসন্দেহে প্রযুক্তিনির্ভর এক নতুন বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের ইঙ্গিত দিচ্ছে।