মঙ্গলবার, 22 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা

সিলেট-তামাবিল সড়কে অনুমোদনহীন বৃক্ষনিধন: সওজ-বন বিভাগের দ্বন্দ্বে প্রশ্নবিদ্ধ সরকারি সমন্বয়

সিলেট-তামাবিল সড়কের একটি নির্দিষ্ট অংশে চার লেন প্রকল্পের আওতায় না থাকা সত্ত্বেও বন বিভাগ কর্তৃক গাছ কাটার ঘটনা তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) জানিয়েছে, টিলাগড় থেকে সুরমা গেট পর্যন্ত অংশে গাছ কাটার কোনো অনুমোদন নেই, যা সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবকে স্পষ্ট করেছে এবং জনমনে প্রশ্ন তুলেছে।

শেয়ার করুন:

সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের আওতাভুক্ত না হওয়া সত্ত্বেও গাছ কাটার ঘটনা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে টিলাগড় থেকে সুরমা গেট পর্যন্ত এলাকায় এই বৃক্ষনিধনের ঘটনা সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবকে স্পষ্ট করে তুলেছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, এই নির্দিষ্ট অংশে গাছ কাটার কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি, কারণ এটি চলমান চার লেন প্রকল্পের বর্তমান ধাপের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে, সওজের এই অবস্থান সত্ত্বেও বন বিভাগ নির্বিচারে গাছ কেটে চলেছে, যা জনমনে ব্যাপক প্রশ্ন ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয় প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সিলেট-তামাবিল সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার বৃহৎ প্রকল্পটি মূলত সুরমা গেট এলাকা থেকে শুরু হওয়ার কথা। এই উন্নয়ন কাজের প্রধান লক্ষ্য হলো সড়কের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যানজট কমিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও মসৃণ করা। প্রকল্পের নকশা ও বাস্তবায়নের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, টিলাগড় থেকে সুরমা গেট পর্যন্ত অংশটি বর্তমান চার লেন প্রকল্পের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, এই অংশে কোনো নতুন নির্মাণ কাজ বা সড়কের প্রশস্তকরণ আপাতত হওয়ার কথা নয়, ফলে গাছ কাটারও কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, টিলাগড় থেকে সুরমা গেট পর্যন্ত সড়কের পাশে গাছ কাটার জন্য তাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অনুমতি বা ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যেহেতু এই অংশটি প্রকল্পের বর্তমান কর্মপরিধির বাইরে, তাই এখানে বৃক্ষনিধনের কোনো প্রয়োজন বা আইনগত ভিত্তি নেই। সওজ কর্মকর্তারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন যে, তাদের অনুমোদন ছাড়া অন্য কোনো সরকারি সংস্থা কীভাবে এই ধরনের কাজ করতে পারে, তা বোধগম্য নয়। এই ধরনের কার্যক্রম সরকারি বিধিমালা ও আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়ের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে তারা মনে করছেন।

অন্যদিকে, সওজের এমন সুস্পষ্ট ঘোষণা সত্ত্বেও বন বিভাগ বিতর্কিত এই অংশে গাছ কাটার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে শ্রমিকরা নিয়মিতভাবে এই সড়কের গাছ কাটছে, যা দেখে স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশকর্মীরা হতবাক। বন বিভাগ কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো ব্যাখ্যা না দিলেও, তাদের কার্যক্রম সওজের বক্তব্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে। এই পরিস্থিতি সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুতর ঘাটতি নির্দেশ করে, যা একটি স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিপন্থী।

এই অননুমোদিত বৃক্ষনিধনের ঘটনা সিলেটজুড়ে ব্যাপক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এই নির্বিচার গাছ কাটার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং অবিলম্বে তা বন্ধ করার দাবি তুলেছে। তারা প্রশ্ন তুলেছে, যে জায়গায় উন্নয়নের কাজই হবে না, সেখানে কেন গাছ কাটা হচ্ছে? এর পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে কিনা, তা নিয়েও অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সবুজ সিলেট এমনিতেই পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে, এমন পরিস্থিতিতে বিনা প্রয়োজনে গাছ কাটা পরিবেশের ভারসাম্যকে আরও নষ্ট করবে এবং ভবিষ্যতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

পরিবেশবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদরা এই ঘটনাকে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার এক চরম উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, যখন একটি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য গাছ কাটার প্রয়োজন হয়, তখন পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থার মধ্যে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও অনুমোদনের ধাপ অনুসরণ করা আবশ্যক। কিন্তু সিলেট-তামাবিল সড়কের এই ঘটনায় সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এর ফলে শুধু পরিবেশের ক্ষতিই হচ্ছে না, বরং জনমনে সরকারি ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতাও তৈরি হচ্ছে।

এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে এনেছে। একটি দেশের উন্নয়নে যখন একাধিক সরকারি সংস্থা কাজ করে, তখন তাদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি, তথ্য আদান-প্রদান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট সমন্বয় থাকা জরুরি। সিলেট-তামাবিল সড়কের ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই ধরনের সমন্বয়ের অভাবে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হতে পারে, তেমনি জনস্বার্থও উপেক্ষিত হতে পারে এবং পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে, সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন। একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অননুমোদিত বৃক্ষনিধনের কারণ উদঘাটন এবং এর সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত। একই সাথে, ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের সমন্বয়হীনতার কারণে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে বিঘ্ন না ঘটে বা পরিবেশের ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও তার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এটি কেবল সিলেটের পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং সমগ্র দেশের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্যও অত্যাবশ্যকীয়।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ