বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার গারুরিয়া ইউনিয়নের রবিপুর গ্রামে প্রায় একশ একর আবাদি জমি পানি নিষ্কাশনের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে অনাবাদি পড়ে রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় স্থানীয় কৃষকরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। নিজেদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। দ্রুত এই সমস্যার সমাধানে সরকারি হস্তক্ষেপের দাবিতে মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় কৃষকদের উদ্যোগে এক বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। মানববন্ধনে অংশ নিয়ে কৃষকরা তাদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন এবং সরকারের কাছে জরুরি ভিত্তিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, রবিপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ এই কৃষি জমিতে বছরের পর বছর ধরে জলাবদ্ধতা একটি নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে প্রাকৃতিক খাল ও নালার মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি সরতে পারে না। এর ফলে জমিতে দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকে এবং চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। একসময় যে জমিগুলো সবুজের সমারোহে ভরে থাকত, আজ সেখানে কেবল আগাছা আর কচুরিপানাই চোখে পড়ে। কৃষকরা জানান, তারা এই জমিগুলোতে ধান, পাট, সবজি সহ বিভিন্ন ফসল ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন, কিন্তু বর্তমানে তা সম্ভব হচ্ছে না।
রবিপুর গ্রামের একাধিক কৃষক জানান, তাদের পৈতৃক ভিটার এই জমিই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা। জমি চাষাবাদ করে তারা পরিবারের মুখে অন্ন যোগাতেন, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে জমি অনাবাদি থাকায় তাদের জীবন ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে কৃষি কাজ ছেড়ে দিনমজুরের কাজ খুঁজছেন, যা তাদের জন্য অত্যন্ত অসম্মানজনক এবং কষ্টকর। ঋণের বোঝাও বাড়ছে অনেক কৃষকের। তারা আক্ষেপ করে বলেন, হাতে জমি থাকা সত্ত্বেও তারা অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
ভুক্তভোগী কৃষকদের মতে, এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। গ্রামের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ছোট ছোট খাল ও নালাগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে এবং অনেক স্থানে অবৈধ দখলদারদের কারণে এগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি বা বন্যার পানি বের হতে পারছে না। তারা দাবি জানান, স্থানীয় প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে খালগুলো পুনরায় খনন করুক এবং প্রয়োজনে নতুন নিষ্কাশন পথ তৈরি করুক। এতে শুধু রবিপুর গ্রাম নয়, আশপাশের আরও কয়েকটি গ্রামের কৃষি জমির জলাবদ্ধতা নিরসন হবে বলে তারা মনে করেন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কৃষকদের প্রতিনিধিরা বলেন, তারা ইতিপূর্বেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এই সমস্যা সমাধানের জন্য আবেদন জানিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। তারা আরও বলেন, যদি দ্রুত এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামী মৌসুমেও তাদের জমি অনাবাদি থেকে যাবে এবং তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। তারা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, কৃষি খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাতে এই সমস্যা সমাধানের বিকল্প নেই।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাকেরগঞ্জ উপজেলায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু রবিপুরের মতো অনেক স্থানে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে কৃষকদের কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের সমস্যা নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন, যেখানে স্থানীয় সরকার, কৃষি বিভাগ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকবে। অনাবাদি জমিকে আবাদের আওতায় আনতে পারলে একদিকে যেমন খাদ্য উৎপাদন বাড়বে, তেমনি কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থাও উন্নত হবে।
এই বিষয়ে বাকেরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কৃষকদের দাবির বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তারা সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে কৃষকরা দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন, যাতে তারা তাদের পূর্বের পেশায় ফিরে যেতে পারেন এবং তাদের পরিবার নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। রবিপুরের কৃষকদের এই আন্দোলন বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের কৃষকদের জন্যও একটি বার্তা বহন করে, যেখানে পানি ব্যবস্থাপনা আধুনিক কৃষির জন্য একটি অপরিহার্য দিক।
অপেক্ষাকৃত কম বৃষ্টিপাতের মৌসুমেও যদি এই সমস্যা সমাধান না করা হয়, তবে আগামী বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই সময় থাকতে এই বিষয়ে একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। কৃষকদের এই যৌক্তিক দাবি পূরণ হলে শুধু তাদের ব্যক্তিগত জীবন নয়, দেশের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা বর্তমান সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে।