সম্প্রতি বাংলাদেশে শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই মর্মান্তিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রায়শই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: আধুনিক প্রযুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ স্মার্টফোন এই নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার পেছনে কতটা দায়ী? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্মার্টফোনের সঠিক ও বেঠিক উভয় ব্যবহারই শিশুদের নিরাপত্তা এবং তাদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলছে। সমাজের প্রতিটি স্তরে এই বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা ও আলোচনার প্রয়োজন অনস্বীকার্য, কারণ শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব।
একদিকে, শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তাদের বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। খেলার মাঠ বা জনসমাগমস্থলে শিশুরা যখন মোবাইল ফোনে মগ্ন থাকে, তখন তারা পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে অসচেতন হয়ে পড়ে। এই অসচেতনতা তাদের অপহরণ বা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। এছাড়া, অপরিচিতদের সাথে অনলাইন যোগাযোগ, গেমিং প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদান এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কদের উপস্থিতি তাদের জন্য নতুন বিপদ তৈরি করছে। এসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিশুদের অবাধ বিচরণ তাদের অজান্তেই অনেক সময় বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিকারিরা সহজেই শিশুদের টার্গেট করতে পারে। মিথ্যা পরিচয়ে বন্ধুত্ব স্থাপন, প্রলোভন দেখানো এবং শেষ পর্যন্ত শিশুদের বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে বা নির্দিষ্ট স্থানে আসতে উৎসাহিত করার মতো ঘটনাগুলো আজকাল প্রায়শই শোনা যায়। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে অনেক শিশু মানসিক চাপে ভোগে এবং কখনো কখনো চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়, যা তাদের নিখোঁজ হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে। ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমের অবাধ প্রবেশাধিকার শিশুদের এমন সব বিষয়বস্তুর সংস্পর্শে আনছে যা তাদের বয়স বা মানসিক বিকাশের জন্য উপযুক্ত নয় এবং যা তাদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে, স্মার্টফোন শুধুমাত্র ঝুঁকির কারণ নয়, এটি শিশুদের সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী হাতিয়ারও হতে পারে। জরুরি পরিস্থিতিতে অভিভাবকের সাথে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন, সাহায্যের জন্য কল করা অথবা লোকেশন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে শিশুদের অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব। যদি স্মার্টফোন সঠিক তত্ত্বাবধানে এবং নিরাপদ উপায়ে ব্যবহৃত হয়, তবে এটি শিশুদের জন্য একটি নিরাপত্তা জাল হিসেবে কাজ করতে পারে। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন, যাতে তারা যেকোনো সময় তাদের সন্তানের খোঁজ নিতে পারেন এবং নিশ্চিত থাকতে পারেন যে তারা নিরাপদ আছে।
এই দ্বিমুখী প্রেক্ষাপটে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার আগে তাদের বয়স, মানসিক পরিপক্কতা এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্য বিবেচনা করা উচিত। স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করা, কোন অ্যাপ ব্যবহার করছে তা পর্যবেক্ষণ করা, এবং অনলাইনে তারা কাদের সাথে যোগাযোগ করছে সে বিষয়ে নজর রাখা অপরিহার্য। শিশুদের অনলাইন কার্যকলাপের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অ্যাপস ব্যবহার করা যেতে পারে, যা ক্ষতিকারক ওয়েবসাইট বা অ্যাপ থেকে শিশুদের দূরে রাখবে এবং তাদের ডিজিটাল দুনিয়ায় নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করবে।
অভিভাবকদের উচিত শিশুদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করা। ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় কী ধরনের বিপদ আসতে পারে, অপরিচিতদের সাথে তথ্য আদান-প্রদান কতটা বিপজ্জনক, এবং অনলাইনে কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে কী করা উচিত – এসব বিষয়ে তাদের সচেতন করা জরুরি। শিশুদের বোঝাতে হবে যে, তারা কোনো সমস্যায় পড়লে বা ভয় পেলে যেন নির্দ্বিধায় অভিভাবকদের জানায় এবং তাদের বিশ্বাস অর্জন করা। এই ধরনের খোলামেলা সম্পর্ক শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং তাদের ডিজিটাল বিশ্বের বিপদ থেকে নিরাপদ রাখতে সাহায্য করে, যা তাদের বেড়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পরিবারে একটি ডিজিটাল নীতিমালা তৈরি করা যেতে পারে। শিশুরা কখন, কোথায় এবং কতক্ষণ মোবাইল ফোন ব্যবহার করবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা উচিত। বাড়ির বাইরে বের হওয়ার সময় শিশুদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে, বিশেষ করে জনবহুল স্থানে বা অপরিচিত পরিবেশে। লোকেশন শেয়ারিং ফিচারটি কীভাবে নিরাপদভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়েও শিশুদের প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত, যাতে জরুরি অবস্থায় তাদের অবস্থান দ্রুত জানা যায় এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়।
পরিশেষে বলা যায়, শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা রোধে মোবাইল ফোনের দায়ভার এককভাবে প্রযুক্তির উপর চাপানো সম্ভব নয়। বরং এটি প্রযুক্তি, পরিবার এবং সমাজের সম্মিলিত দায়িত্বের প্রশ্ন। স্মার্টফোনের সঠিক ও সচেতন ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিভাবকদের নিরন্তর তদারকি, শিক্ষা এবং শিশুদের সাথে সুস্থ সম্পর্ক স্থাপনই পারে তাদের ডিজিটাল বিশ্বের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করে এর অপব্যবহার রোধ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, যাতে আমাদের শিশুরা একটি নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে।