দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব হ্রাসে কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসারে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন, যেখানে তিনি আধুনিক শ্রমবাজারের চাহিদা মেটাতে এবং তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপতির এই দূরদর্শী আহ্বান এমন এক সময়ে এলো যখন বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ কাজে লাগাতে এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন যে, শুধুমাত্র প্রচলিত সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তরুণ প্রজন্ম কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, হাতে-কলমে শিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী কেবল নিজের জন্য নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও আধুনিক ও কর্মমুখী করতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত জরুরি, যা একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি স্থাপন করবে।
শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ঘাটতি নিয়ে আলোচনা করছেন। দেখা যাচ্ছে, উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ প্রচলিত ডিগ্রিধারীরা শিল্প ও বাণিজ্যের বাস্তব চাহিদা পূরণে প্রায়শই অক্ষম। অন্যদিকে, দক্ষ কারিগর ও প্রযুক্তিবিদদের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে, বিশেষ করে পোশাক শিল্প, নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে। এই অসামঞ্জস্য দূর করতে এবং দেশের মানবসম্পদকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে কারিগরি শিক্ষার প্রসার অপরিহার্য বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
কারিগরি শিক্ষা কেবল কর্মসংস্থান তৈরি করে না, বরং উদ্যোক্তা তৈরিতেও সহায়ক। একজন কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ সহজেই নিজের ব্যবসা শুরু করতে পারে, যা আরও দশজনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ায়। এটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কারণ বিদেশে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা ব্যাপক। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের অদক্ষ শ্রমিকরা সাধারণত কম মজুরি পেলেও, দক্ষ কারিগররা উন্নত জীবনযাত্রার সুযোগ পাচ্ছে। তাই, কারিগরি শিক্ষা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতেও সরাসরি অবদান রেখে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে।
সরকার ইতোমধ্যে কারিগরি শিক্ষার প্রসারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে নতুন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়ন এবং কারিকুলাম সংস্কার অন্যতম। রাষ্ট্রপতির এই আহ্বান সরকারের চলমান প্রচেষ্টাকে আরও গতিশীল করবে এবং নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়ে আরও মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করবে। শিক্ষাবিদরা মনে করেন, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষাকে আরও কার্যকর ও বাজারমুখী করা সম্ভব, যা শিল্প খাতের সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সেতুবন্ধন তৈরি করবে।
সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে এখনও কারিগরি শিক্ষাকে 'দ্বিতীয় শ্রেণীর' শিক্ষা হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে, যা এই খাতের অগ্রগতিতে একটি বড় বাধা। রাষ্ট্রপতির এই বার্তা সেই ভুল ধারণাকে দূর করতে এবং কারিগরি শিক্ষার মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। তিনি তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা গতানুগতিক ধারার বাইরে এসে কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষায় আগ্রহী হয়, যা তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে। দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য এই মানসিকতার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনে সহায়তা করবে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) এবং বিগ ডেটার মতো প্রযুক্তিগুলো শ্রমবাজারকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে হলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে অবশ্যই প্রযুক্তি-ভিত্তিক এবং দক্ষতা-কেন্দ্রিক হতে হবে। কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অত্যাধুনিক ল্যাব এবং প্রশিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করতে হবে, যাতে তারা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হয়।
পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই দূরদর্শী আহ্বান কেবল একটি বক্তব্য নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ। বেকারত্ব হ্রাস, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষায় বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। এই পথ ধরেই বাংলাদেশ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কাতারে শামিল হতে পারবে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, যা দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।