সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং হৃদয়ের না-বলা টান—এই দুইয়ের জটিল টানাপোড়েন মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রায়শই এক দুরূহ পথে ঠেলে দেয়। দুই বিপরীত মেরুর মানুষের মধ্যকার সূক্ষ্ম অনুভূতি, প্রচলিত সামাজিক রীতি, সংস্কার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার দ্বন্দ্বকে উপজীব্য করে বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘দত্তা’। এই কালজয়ী সৃষ্টিকে নিজেদের যাপিত জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে অনুধাবন করার লক্ষ্যে সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) বন্ধুসভা এক বিশেষ পাঠচক্রের আয়োজন করে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) ১০ নম্বর কক্ষে এই পাঠচক্রের আসর বসেছিল। উপন্যাসটির চরিত্র ও ঘটনাপ্রবাহের গভীরে প্রবেশ করে সমকালীন প্রেক্ষাপটে এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করাই ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। অংশগ্রহণকারী বন্ধুরা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে উপন্যাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন, যা আলোচনাকে এক নতুন মাত্রা প্রদান করে।
পাঠচক্রের মূল আলোচক হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন বন্ধু সিফাত আল সাকিব। তাঁর আলোচনায় ‘দত্তা’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিজয়া, নরেন ও বিলাসের সম্পর্কের টানাপোড়েন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে আসে। তিনি ব্রাহ্ম ও সনাতন ধর্মীয় পরিমণ্ডলের সামাজিক দ্বন্দ্ব, তৎকালীন পারিবারিক মূল্যবোধ এবং চরিত্রগুলোর মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের বিভিন্ন স্তর বিশ্লেষণ করেন। সিফাত আল সাকিব তাঁর বক্তব্যে দেখিয়ে দেন কীভাবে শরৎচন্দ্র এই উপন্যাসে ব্যক্তিমানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বকে সমাজের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে স্থাপন করেছেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) ক্রীড়া সম্পাদক মাহমুদুল হাসান বলেন, “শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানবমনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভঙ্গিতে স্পর্শ করতে পারা। ‘দত্তা’ উপন্যাসে বিজয়া চরিত্রটি যেন আত্মসম্মানবোধ এবং দ্বিধাদ্বন্দ্বের এক অনন্য মেলবন্ধন। বাবার দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং নিজের অনুভূতির লড়াইয়ে বিজয়ার যে দোলাচল, তা সমকালের যেকোনো মানুষের সিদ্ধান্তহীনতার সঙ্গেই মিলে যায়। বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা এই মানসিক টানাপোড়েন আজও আমাদের নিজেদের জীবন ও চারপাশের সম্পর্কগুলোকে নতুন করে উপলব্ধি করতে শেখায়।” তাঁর এই মন্তব্য উপন্যাসের সর্বজনীন আবেদনকে তুলে ধরে।
মুক্ত আলোচনা পর্বে অংশগ্রহণকারী বন্ধুরা উপন্যাসের নানা চরিত্রের আচরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বিলাসবিহারীর আধিপত্যকামী মনোভাব এবং নরেনের নির্লিপ্ত অথচ দৃঢ় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বর্তমান সমাজের নানা ঘটনার সাদৃশ্য তুলে ধরেন তারা। এই আলোচনা কেবল সাহিত্যের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, মানব সম্পর্ক এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের এক প্রাণবন্ত আড্ডায় রূপ নেয়। এটি প্রমাণ করে যে, ক্লাসিক সাহিত্য কীভাবে সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে।
জাবি বন্ধুসভার সাবেক সাধারণ সম্পাদক অনুপ সরকার তাঁর বক্তব্যে বলেন, “দত্তা’ শুধু নিছক কোনো প্রেমের আখ্যান নয়; বরং এখানে ব্যক্তির সিদ্ধান্তের সঙ্গে পরিবার, সমাজ ও আত্মবিশ্বাসের সংঘাত অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধরা পড়েছে। শরৎচন্দ্রের এই সৃষ্টির ভেতর দিয়ে নিজেদের চারপাশের মানুষের মানসিকতা ও বাস্তব জীবনকেও নতুন করে চেনা যায়।” তাঁর এই বিশ্লেষণ উপন্যাসের বহুমুখী তাৎপর্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
পাঠচক্রে জাবি বন্ধুসভার সভাপতি সৈয়দ সালমান হাসান, সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, সহসাংগঠনিক সম্পাদক অরূপা রহমান, অর্থ সম্পাদক পারভেজ মোশাররফ, সাংস্কৃতিক সম্পাদক তাসনিম সুলতানা, পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক মারিয়া মুরাদ, দপ্তর সম্পাদক অরিত্র গুহ, প্রচার সম্পাদক অরুণিমা পাল এবং বন্ধু দ্বীপ তৌমুরসহ বন্ধুসভার অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ আয়োজনটিকে সফল করে তোলে।
এই ধরনের পাঠচক্র একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়, তেমনই অন্যদিকে সমাজ ও মানব সম্পর্ক নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনার সুযোগ তৈরি করে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে এমন আলোচনা বর্তমান প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও শিক্ষণীয়, যা তাদের মননশীলতার বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।