বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাল্যবিবাহের ভয়াল থাবা কিশোরীদের স্বপ্নকে কীভাবে গ্রাস করছে, তার এক মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে ওঠে গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র নদের চরের কুন্দেরপাড়া গণ-উন্নয়ন একাডেমির প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কথায়। এদেরই একজন, যিনি নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় নিজের বাল্যবিবাহ রুখে দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করে বৃত্তি নিয়ে গাইবান্ধা কলেজ এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। এখন তিনি নিজ চরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা নিঃসন্দেহে এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের অসংখ্য মেয়ের জীবন তাঁর মতো নয়। তাঁদের স্বপ্নগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে বাল্যবিবাহের নিষ্ঠুর শিকলে।
এই অনুপ্রেরণামূলক ব্যতিক্রমের বিপরীতে দেশের বৃহত্তর চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ইসলামকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির ১৩ জন ছাত্রীর গত দুই বছরের মধ্যে বাল্যবিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর যৌথভাবে প্রকাশিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’-এর প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এবং ১৩ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। যদিও ২০১৯ সালের তুলনায় এই হার কিছুটা কমেছে, তবে প্রায় প্রতি দুই নারীর একজনের ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হওয়ার এই বাস্তবতা সামান্য অগ্রগতি নিয়ে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ রাখে না, বরং এটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতাকেই প্রকটভাবে তুলে ধরে।
বাল্যবিবাহের সঙ্গে দারিদ্র্য ও শিক্ষার সম্পর্ক অত্যন্ত সুস্পষ্ট। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যেসব নারী কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি, তাঁদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার ৬৯ শতাংশ, যা শিক্ষাবঞ্চিতদের ঝুঁকির গভীরতা নির্দেশ করে। একইসাথে, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের নারীদের মধ্যে এই হার ৬৫ শতাংশ। এর বিপরীতে, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাসম্পন্ন নারীদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার ২৮ শতাংশ এবং সবচেয়ে ধনী পরিবারের নারীদের মধ্যে এটি ৪১ শতাংশ। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
বাল্যবিবাহ শুধু একটি ক্ষতিকর সামাজিক প্রথা নয়, এটি শিশু অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন এবং এক ধরনের যৌন নির্যাতনও বটে। একটি অপরিণত শিশুকে বিয়ের নামে এমন একটি সম্পর্কে ঠেলে দেওয়া হয়, যার জন্য সে শারীরিক বা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে না এবং যেখানে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তার থাকে না। বিয়ের পর অধিকাংশ মেয়ের পক্ষে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে তাদের সম্ভাবনা বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। বাল্যবিবাহের শিকার কিশোরীদের গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিও বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে সন্তান জন্মদানের হার ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ জনমিতি এবং স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, এই বয়সী ২৩ দশমিক ২ শতাংশ কিশোরী ইতিমধ্যে সন্তান ধারণ শুরু করেছে এবং ১ দশমিক ২ শতাংশ ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মা হয়েছে। অল্প বয়সে গর্ভধারণের পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর। এতে মৃত সন্তান প্রসব, অপরিণত শিশুর জন্ম এবং মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা জনস্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
আইনের দুর্বল প্রয়োগ বাল্যবিবাহকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম কারণ। এছাড়া, মেয়েরা যৌন নিপীড়নের শিকার হতে পারে কিংবা কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে পরিবারের ‘সম্মান’ ক্ষুণ্ন হবে, এমন আশঙ্কা থেকেও অনেক মা-বাবা মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন। পরিবার ও সমাজের একটি বড় অংশ এখনও মনে করে যে বিয়ে, সন্তানধারণ ও তাদের বড় করাই মেয়েদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য। মেয়েদের পড়াশোনা, নিজের পায়ে দাঁড়ানো কিংবা পেশাগত সাফল্যকে যথেষ্ট মূল্য দেওয়া হয় না, যা এই প্রথাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
সম্প্রতি গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জের কয়েকজন কিশোরীর সঙ্গে কথা বলার সময় তারা এই বৈষম্যের কথা খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। একজন বলেছিল, “ছেলেরা পরীক্ষায় খারাপ করলে মা-বাবা তাদের আবার সুযোগ দেন। কিন্তু মেয়েদের পরীক্ষার আগেই ভয় দেখানো হয়, পাস করতে না পারলে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে।” আরেকজন কিশোরী জানায়, “মাধ্যমিক পাস করলে মেয়েরা অনেক কিছু বুঝতে শিখবে, তখন তাদের বিয়ে দেওয়া কঠিন হবে, এই কথা ভেবে অনেক পরিবার স্কুলে পড়ার সময়ই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়।” আরেক কিশোরীর কথা, “আমি হয়তো মা-বাবাকে বুঝিয়ে আমার বিয়ে বন্ধ করতে পারব। কিন্তু সমাজের মানুষ এসে বলবে, এত ভালো পাত্র পাওয়া গেছে, এখনই মেয়ের বিয়ে দাও। তখন মা-বাবার পক্ষে না বলা কঠিন হয়ে যাবে।” অল্প বয়সে বিয়ে দিলে যৌতুক কম লাগে, এমন মন্তব্যও কিশোরীরা করেছে, যা সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের প্রতিফলন।
এইসব মন্তব্য মেয়ে এবং নারীদের বিষয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির গভীর সংকটের প্রতিফলন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আয় ও জীবিকার অনিশ্চয়তায় পড়া অনেক পরিবার কিশোরী মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। বাল্যবিবাহের এই চক্র ভাঙতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ প্রসার এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কেবল সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কিশোরীদের স্বপ্নকে বাঁচানো এবং তাদের একটি সুস্থ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।