দেশের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) এক অভাবনীয় দাবি করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তাদের ভাষ্যমতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে মাত্র ১৮ লাখ টাকা অনুদান পেলেও গত এক বছরে তারা প্রায় ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকার বিভিন্ন কাজ ও কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে। জাকসুর এই দাবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও সুশীল সমাজে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে ছাত্র সংসদের কার্যকারিতা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং অর্থায়নের উৎস নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে।
জাকসু কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরের সময়কালে তারা মোট ৩৩৮টি ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি ও উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করেছে। এই কর্মসূচিগুলোর মধ্যে শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক বিকাশে সহায়তা, ক্রীড়া কার্যক্রমের আয়োজন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক প্রচারাভিযান, বিভিন্ন সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন, এবং ছোটখাটো অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজও অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়, তার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দেওয়া অনুদানের অঙ্কের বিস্তর ফারাক থাকায় এই দাবি আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ছাত্র সংসদ সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত ১৮ লাখ টাকা মূলত জাকসুর দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা, অফিস ব্যবস্থাপনা এবং কিছু নির্দিষ্ট ছোটখাটো ইভেন্টের জন্য বরাদ্দ ছিল। কিন্তু জাকসুর দাবি অনুযায়ী, তারা এর বাইরেও বহু বড় আকারের প্রকল্প ও কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, যার জন্য তারা নিজেদের অর্থায়নের পথ খুঁজে নিয়েছে। এই অতিরিক্ত অর্থের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ না হলেও, ধারণা করা হচ্ছে যে, শিক্ষার্থীদের চাঁদা, বিভিন্ন স্পন্সরশিপ, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অনুদান এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, তাদের কল্যাণে কাজ করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক চর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। দীর্ঘ বিরতির পর জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা যায়। বর্তমান কমিটির কার্যক্রমে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের দাবি তাদের সক্রিয়তা ও দায়বদ্ধতার প্রমাণ হিসেবে দেখা যেতে পারে, তবে একই সাথে এটি অর্থায়নের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নও উত্থাপন করছে।
এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে এবং একাডেমিক মহলে এই বিষয়ে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, জাকসু কিভাবে এত বিশাল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয় করলো, এবং এই ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন কবে নাগাদ প্রকাশ করা হবে। আর্থিক ব্যবস্থাপনার এই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ছাত্র সংসদের জন্য অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাকসুর এই দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে এটি দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদগুলোর জন্য একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। এটি প্রমাণ করবে যে, সীমিত সরকারি অনুদান সত্ত্বেও একটি সক্রিয় ও সৃজনশীল ছাত্র সংসদ নিজেদের উদ্যোগে বড় আকারের কাজ করতে সক্ষম। তবে, এর পেছনে থাকা আর্থিক প্রক্রিয়া এবং এর বৈধতা নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত ও জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘটনাটি কেবল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং দেশের সামগ্রিক ছাত্র রাজনীতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। জাকসুর এই সাহসী দাবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ছাত্র সংগঠনগুলোর অর্থায়ন এবং তাদের কার্যক্রমের পরিধি সম্পর্কে আরও গভীরভাবে ভাবতে উৎসাহিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে এই দাবির সত্যতা যাচাই এবং এর বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের উপর সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকবে।