রাজধানীর অন্যতম প্রধান রেল হাব কমলাপুর রেলস্টেশনে রবিবার সন্ধ্যায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে দুর্বৃত্তরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এই আকস্মিক ঘটনায় পুরো স্টেশনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের বেশ কয়েকটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়। এই ঘটনাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নাশকতা হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
প্রত্যক্ষদর্শী ও রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে স্টেশনের ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মে নোয়াখালীগামী উপকূল এক্সপ্রেসের একটি বগির ভেতর থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ধোঁয়া আগুনের লেলিহান শিখায় পরিণত হয় এবং দ্রুত তা পার্শ্ববর্তী বগিতে ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়। ট্রেনের ভেতরে তখন কোনো যাত্রী না থাকলেও, প্ল্যাটফর্মে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও রেলওয়ে কর্মচারীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। আগুনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, দূর থেকেও কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছিল, যা নগরীর আকাশ ঢেকে ফেলেছিল এক ভীতিকর আবরণে।
খবর পেয়ে দ্রুত ফায়ার সার্ভিসের ৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। প্রায় দেড় ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর চেষ্টায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক (অপারেশন) জানান, আগুনের সূত্রপাত রহস্যজনক এবং প্রাথমিক আলামত দেখে মনে হচ্ছে এটি ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ট্রেনের দুটি বগি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে একটি বগি প্রায় সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অন্যান্য বগিতেও সামান্য ক্ষতি হয়েছে।
এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, যা কিছুটা স্বস্তিদায়ক। তবে ট্রেনের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। রেলওয়ের মহাপরিচালক ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং সাংবাদিকদের জানান যে, এটি একটি পরিকল্পিত নাশকতা। তিনি বলেন, “আমরা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করছি এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইআইডি) ও রেলওয়ে পুলিশকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা এই জঘন্য কাজের সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পরপরই কমলাপুর রেলস্টেশন ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সন্দেহভাজন কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং ঘটনার পেছনের উদ্দেশ্য উদঘাটনে বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, ট্রেনের ওই বগিতে দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছিল, যা আগুনকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে। এই ধরনের ঘটনা রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানোর একটি অপচেষ্টা বলে মনে করছে পুলিশ প্রশাসন।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে উপকূল এক্সপ্রেসের যাত্রা সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়েছে এবং এর যাত্রীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবা হচ্ছে। এই ধরনের নাশকতা দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সময়ে রেললাইনে নাশকতার ঘটনা ঘটলেও, স্টেশনের ভেতরে সরাসরি ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনা বেশ বিরল এবং উদ্বেগের কারণ। এই ঘটনা রেলওয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, এই ধরনের উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সতর্ক থাকতে এবং কোনো অস্বাভাবিক গতিবিধি লক্ষ্য করলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানাতে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে।
এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে এবং আশা করা হচ্ছে দ্রুতই এর পেছনের রহস্য উন্মোচিত হবে। জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করার সাহস না পায়। রেলওয়ে এবং সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এমন যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে।