কুমিল্লা, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬: নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর আজ শনিবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রোববার ক্যাম্পাসে সাধারণ শোক ঘোষণা করেছে এবং সকল ক্লাস ও পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অপ্রতিমের জানাজা ও দাফন আগামীকাল রোববার সম্পন্ন হবে বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। এই হত্যাকাণ্ড কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারসহ সমগ্র কুমিল্লায় গভীর শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শনিবার বেলা একটার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে। নিহত অপ্রতিম কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র ছিল। পরিবারের ভাষ্যমতে, গত শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে বন্ধুদের সাথে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোন নিয়ে কোটবাড়ি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হয়েছিল সে। এরপর থেকেই তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না এবং তার সাথে থাকা আইফোনটিও এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২০ সেপ্টেম্বর, রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগের ক্লাস এবং পূর্বনির্ধারিত সকল পরীক্ষা স্থগিত থাকবে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, স্থগিত হওয়া পরীক্ষার নতুন সময়সূচি পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহ নোটিশের মাধ্যমে জানিয়ে দেবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম শনিবার রাতে জানিয়েছেন, অপ্রতিমের প্রথম জানাজা আগামীকাল রোববার সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সর্বস্তরের মানুষ এই জানাজায় অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় মাঠে জানাজার পর বেলা ১১টায় অপ্রতিমের গন্ধমতি এলাকার বর্তমান বাসার কাছে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর সেখানেই তাকে দাফন করা হবে বলে প্রক্টর নিশ্চিত করেছেন। এই আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে শোকাহত পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা হবে।
এদিকে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে। ইতোমধ্যে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ১৭ বছর বয়সী দুই কিশোরকে আটক করা হয়েছে। কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান জানিয়েছেন, আটককৃতদের বর্তমানে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ এবং এর সাথে জড়িত অন্যান্যদের খুঁজে বের করতে নিবিড়ভাবে কাজ করছে বলে জানা গেছে।
এই ঘটনা কুমিল্লা অঞ্চলের কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা সম্পর্কে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একজন মেধাবী ছাত্রের এমন নৃশংস মৃত্যু কেবল তার পরিবারকেই নয়, পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনসমাজকেও স্তম্ভিত করেছে। বিভিন্ন মহল থেকে অপ্রতিমের হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য জোর দাবি জানানো হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের সম্পূর্ণ রহস্য উন্মোচন করে দোষীদের আইনের আওতায় আনবে বলে সকলে প্রত্যাশা করছে।