শুক্রবার, 18 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
অপরাধ 🇧🇩 বাংলা

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি: 'গলফ অপারেশন'-এর তথ্য ফাঁস করায় আলকাছ মাঝিকে হত্যার নির্দেশ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী চাঞ্চল্যকর জবানবন্দিতে বলেছেন, 'গলফ অপারেশন' নিয়ে তথ্য ফাঁস করায় তৎকালীন গোয়েন্দা শাখার পরিচালক জিয়াউল আহসান আলকাছ মাঝিকে 'এলিমিনেট' বা হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে সাব্বির সেই নির্দেশ পালনে রাজি হননি, তবে এর কিছুদিন পরেই আলকাছ মাঝির নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

শেয়ার করুন:
জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি: 'গলফ অপারেশন'-এর তথ্য ফাঁস করায় আলকাছ মাঝিকে হত্যার নির্দেশ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এক চাঞ্চল্যকর জবানবন্দিতে মেজর (অব.) মো. সাব্বির রহমান ওসমানী দাবি করেছেন যে, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান 'গলফ অপারেশন' সম্পর্কিত তথ্য ফাঁস করে দেওয়ায় আলকাছ মাঝিকে 'এলিমিনেট' বা হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিগত সরকারের আমলে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ১৩তম সাক্ষী হিসেবে বৃহস্পতিবার এই জবানবন্দি দেন সাব্বির রহমান। এই জবানবন্দি দেশের বিচারিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং বহু প্রতীক্ষিত এই মামলার ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

জবানবন্দিতে মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী জানান, তিনি অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে জিয়াউলের দেওয়া আলকাছকে হত্যার নির্দেশ পালনে রাজি হননি। তবে এর মাত্র সপ্তাহখানেকের মধ্যেই তিনি জানতে পারেন যে, আলকাছ মাঝিকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এবং তার পরিবার তার সন্ধান চেয়ে বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ করছে। এই তথ্য মামলার তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনেছে, কারণ এটি একজন প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে আসা একটি সরাসরি অভিযোগ যা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।

২০০৯ সালের অক্টোবরে সাব্বির রহমান র‍্যাব-৮ বরিশালে উপ-অধিনায়ক হিসেবে যোগদান করেন এবং ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি র‍্যাবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময়ে র‍্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন হাসান মাহমুদ খন্দকার এবং গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন তৎকালীন লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান। উল্লেখ্য, 'গলফ অপারেশন' বলতে এমন একটি নৃশংস পদ্ধতিকে বোঝানো হতো যেখানে কোনো ব্যক্তিকে হত্যার পর তার পেট কেটে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে বা সাগরে ফেলে দিয়ে লাশ গুম করা হতো, যাতে লাশের কোনো সন্ধান পাওয়া না যায়। এই ধরনের অপারেশনগুলো চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী তার জবানবন্দিতে আরও বলেন, ২০১১ সালের জুন মাসে জিয়াউল আহসান তাকে ফোন করে 'গলফ কাজে' নিয়োগপ্রাপ্ত মাঝিদের অন্যতম আলকাছ মাঝির বিষয়ে জানতে চান। উত্তরে সাব্বির জানান যে, এই মাঝির ব্যাপারে তার বিশেষ কোনো তথ্য জানা নেই। এই উত্তরে জিয়াউল আহসান কিছুটা বিরক্ত হয়ে তাকে জানান যে, আলকাছ মাঝি 'গলফ অপারেশন' সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য চরদুয়ানী বাজারে বলে বেড়াচ্ছে, যা র‍্যাবের জন্য নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করেছে। এই কথা বলার পরপরই জিয়াউল আলকাছ মাঝিকে 'এলিমিনেট' বা হত্যা করার সরাসরি নির্দেশ দেন।

বিষয়টি শোনার পর সাব্বির রহমান শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত দিয়ে এই গুরুতর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেতে অনুনয়-বিনয় করতে থাকেন। একপর্যায়ে জিয়াউল তাকে বলেন, 'থাক, লাগবে না।' এরপর সাব্বির রহমান ঘটনাটি নিজের অধিনায়ককে জানান। এই কথোপকথন প্রমাণ করে যে, আলকাছ মাঝির কথিত তথ্য ফাঁস এবং তাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে তৎকালীন র‍্যাবের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অবগত ছিলেন, যদিও সাব্বির নিজে এই কাজে সরাসরি জড়িত হননি।

সাব্বির রহমান তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন যে, জিয়াউল 'গলফ অপারেশন' পরিচালনার সময় যেসব মাঝি নৌকা বা ট্রলার চালাতেন, তাদের মধ্যে আলকাছই ছিলেন অন্যতম। জিয়াউলের সঙ্গে যে কয়েকবার তাকে অভিযানে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল, তার অধিকাংশ সময়েই তিনি আলকাছকে মাঝি হিসেবে দেখেছিলেন। এই ঘটনার সপ্তাহখানেক পর হঠাৎ অধিনায়ক তাকে অফিসে ডেকে পাঠান। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, অধিনায়কের সামনে বসা ব্যক্তিরা আলকাছের পরিবার বলে পরিচয় দেন। সে সময় আলকাছের স্ত্রী জানান, চার-পাঁচ দিন আগে জিয়াউল ফোন করে আলকাছকে ডেকে নিয়ে গেছেন এবং এর পর থেকেই তার আর কোনো সন্ধান মিলছে না।

জবানবন্দিতে সাব্বির রহমান ২০১০ সালের মে মাসের এক সন্ধ্যার একটি ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তিনি জানান, সেই সন্ধ্যায় খবর পান যে জিয়াউল আহসান বরিশাল আসছেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই জিয়াউল তার সরকারি গাড়ি ও দুটি মাইক্রোবাস নিয়ে ব্যাটালিয়ন সদরে উপস্থিত হন। আধা ঘণ্টা পর অধিনায়ক ও জিয়াউল অফিস থেকে বের হয়ে গাড়ির কাছে আসেন এবং সাব্বিরকে সঙ্গে যেতে বলেন। সাব্বির জিয়াউলের গাড়ির পেছনে বসেন। ওই গাড়িতে জিয়াউলের সঙ্গে অধিনায়কও ছিলেন। ব্যাটালিয়ন সদর থেকে তাদের গাড়ির পেছনে ঢাকা থেকে আসা র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার মাইক্রোবাস দুটিও চলতে থাকে, যা এই অভিযানের গুরুত্ব ও গোপনীয়তা নির্দেশ করে।

প্রায় দুই ঘণ্টা চলার পর তারা চরদুয়ানী ঘাটে পৌঁছান। সেখানে আগে থেকেই একটি মাছ ধরার ট্রলার প্রস্তুত দেখতে পান। র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা মাইক্রোবাস থেকে নেমে ট্রলারে ওঠেন। সাব্বির রহমান তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, র‍্যাব সদস্যদের সঙ্গে চারজন ব্যক্তিকে মাথায় কালো টুপি পরা ও হাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় ট্রলারে উঠতে দেখেন তিনি। এই চারজনকে ট্রলারের মাছ রাখার খোলে ঢোকানো হয়। এরপর জিয়াউল, অধিনায়ক ও সাব্বিরও ট্রলারে ওঠেন, যা এই ভয়াবহ অভিযানের এক প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তার উপস্থিতিকে নিশ্চিত করে।

জিয়াউল আহসান ট্রলারটিকে মোহনার দিকে নিয়ে যেতে নির্দেশ দেন। সেদিন আবহাওয়া প্রতিকূল ছিল এবং প্রায় দেড় ঘণ্টা চলার পর সামনে এগোনো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে বিষয়টি জিয়াউলকে জানানো হয়। তখন জিয়াউল তাকে পানির গভীরতা মাপার নির্দেশ দেন। সুকানির সহকারীকেও ট্রলারের সামনে গিয়ে পানির গভীরতা মাপতে বলা হয়। তারা কয়েকবার পানির গভীরতা জানানোর পর জিয়াউল গতি কমিয়ে দিতে বলেন। এরপর জিয়াউলের ইশারায় র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা খোল থেকে প্রথম ব্যক্তিকে হাত বাঁধা ও মুখ ঢাকা অবস্থায় পাটাতনে তুলে আনেন। তার গলা ও পায়ে দুটি সিমেন্টভর্তি বস্তা বাঁধা হয়, যা 'গলফ অপারেশন'-এর সংজ্ঞার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এরপর তাকে নির্মমভাবে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়, যা গুম ও হত্যার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। এই ধরনের জবানবন্দি দেশের বিচার ব্যবস্থায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ