পঞ্চগড়ে এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় এক স্কুলছাত্রীকে ফুসলিয়ে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে অপমান ও ক্ষোভে বিষপানে আত্মহত্যার অভিযোগ উঠেছে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় পুলিশ কথিত প্রেমিকসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) রাতে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই স্কুলছাত্রীর মৃত্যু হয়, যা পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। নিহত ছাত্রী পঞ্চগড় সদর উপজেলার বাসিন্দা এবং স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, পেশায় রাজমিস্ত্রি শ্রমিক সুয়েল ওরফে সোহেল (২৫) ওই স্কুলছাত্রীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) রাতে সোহেল মেয়েটিকে ফুসলিয়ে একটি ইজিবাইকে করে পার্শ্ববর্তী হাফিজাবাদ ইউনিয়নের রাজমহল-পূর্ববাগান এলাকার আবু সায়েদের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে সোহেল তার সহযোগীদের সহায়তায় ওই স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই বর্বর ঘটনার পর অভিযুক্তরা মেয়েটিকে বিষয়টি কাউকে না জানানোর জন্য কঠোর হুমকি দেয়।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ধর্ষণের পর গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত প্রায় ২টার দিকে অভিযুক্তরা মেয়েটিকে মডেলহাটগামী একটি ইজিবাইকে তুলে দেয়। ওই ইজিবাইকে একা পেয়ে চালক ও অপর দুই যাত্রীও তাকে যৌন হয়রানির চেষ্টা করে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মেয়েটি প্রাণ বাঁচাতে ইজিবাইক থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ে। ভাগ্যক্রমে, স্থানীয় এক ট্রাক্টরচালকের সহায়তায় সে ওই দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা পায়। পরবর্তীতে রাত আড়াইটার দিকে সে মোবাইলফোনে তার ভাইকে পুরো ঘটনা জানায় এবং পরিবারের সদস্যরা তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসে।
ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) পরিবারের সদস্যরা অভিযুক্ত সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সে উল্টো মেয়েটিকে সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না বলে হুমকি দেয়। এই অপমান, ক্ষোভ এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) বেলা ১১টার দিকে ওই স্কুলছাত্রী কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। দ্রুত তাকে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে সে তিন দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েছে।
তিন দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) রাতে অবশেষে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ওই স্কুলছাত্রীর মৃত্যু হয়। পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মো. রেজওয়ানুল্লাহ এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, কীটনাশক পানের পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল এবং পরে ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়টিও জানা যায়। তিনি আরও জানান, পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে, যা মৃত্যুর কারণ ও ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা দেবে।
এদিকে, এই মর্মান্তিক ঘটনার পর গত রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) ওই স্কুলছাত্রীর বড় ভাই বাদী হয়ে পঞ্চগড় সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় অভিযুক্ত সোহেলসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও তিনজনকে আসামি করা হয়। অভিযোগ আনা হয় ধর্ষণ ও ধর্ষণে সহায়তার। মামলা দায়েরের পরপরই পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত সুয়েল ওরফে সোহেল এবং তার সহযোগী ইজিবাইকচালক রফিকুল ইসলাম ওরফে বাঘা মন্টুকে (২৩) গ্রেপ্তার করে। দুজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
নিহত স্কুলছাত্রীর বড় ভাই গণমাধ্যমকে জানান, সোহেল তার বোনকে বলেছিল যে সে না গেলে নাকি সে বাঁচবে না—এমন মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে তাকে ডেকে নিয়েছিল। তিনি এই নরপশুদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ফাঁসি দাবি করেছেন। পঞ্চগড় সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আশীষ কুমার শীল জানিয়েছেন, স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় জড়িত অন্য অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। দ্রুতই বাকি অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।