বৃহস্পতিবার, 17 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
তারকা জীবন 🇧🇩 বাংলা

সিডনির কোলাহল পেরিয়ে: মঞ্চের বাইরে এক অন্য জেমস

সিডনির মঞ্চে হাজারো দর্শক মাতানোর পর রকস্টার জেমস মেতে উঠেছিলেন নিভৃতচারী আলোকচিত্রী ও গভীর সুরানুরাগীর ভূমিকায়। পথশিল্পীর বেহালায় থমকে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে ক্যামেরা হাতে অপেরা হাউসের ছবি তোলা পর্যন্ত, সিডনিতে তাঁর চার দিনের অভিজ্ঞতা এক অন্য জেমসকে চিনিয়ে দিয়েছে, যেখানে তারকাখ্যাতির আড়ালে ছিল এক কৌতূহলী মন।

শেয়ার করুন:
সিডনির কোলাহল পেরিয়ে: মঞ্চের বাইরে এক অন্য জেমস

আলো ঝলমলে মঞ্চে গিটার হাতে হাজারো দর্শককে মাতিয়ে তোলা রকস্টার জেমসকে আমরা চিনি। কিন্তু সিডনির ব্যস্ত সড়কে পথশিল্পীর সুরে থমকে দাঁড়ানো, অথবা ক্যামেরা হাতে গোধূলির আলোয় অপেরা হাউসের ছবি তুলতে মগ্ন এক জেমসকে ক'জন চেনে? ১২ সেপ্টেম্বর সিডনির নরওয়েস্টের হিলসং কনভেনশন সেন্টারে কলকাতার ফসিলস ব্যান্ডের রূপম ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে নগরবাউল জেমস যখন ‘দুষ্টু ছেলের দল’, ‘তারায় তারায়’, ‘ভিগি ভিগি’ এবং আবেগময় ‘মা’ সহ একাধিক গান পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করছিলেন, তখন সেই দৃশ্য ছিল জেমসের পরিচিত তারকাসুলভ ঝলমলে প্রতিচ্ছবি। কিন্তু কনসার্ট শেষ হতেই দৃশ্যপট বদলে যায়, মঞ্চের আলো-আঁধারির বাইরে বেরিয়ে আসে এক অন্য জেমস—শান্ত, নিভৃতচারী, কৌতূহলী এবং গভীর পর্যবেক্ষক। মঞ্চের বাইরের সেই চার দিনের অভিজ্ঞতাই তুলে ধরেছে তার এই ভিন্ন সত্তা।

কনসার্টের পর আরও চার দিন জেমস সিডনিতে কাটিয়েছেন সম্পূর্ণ নিজের মতো করে। যারা তাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, তারা জানেন জেমস স্বল্পভাষী এবং নিজস্ব বলয়ে থাকতে ভালোবাসেন। সিডনির ব্যস্ত রাস্তায় তাকে একজন সাধারণ পর্যটকের মতোই দেখা গেছে। পথশিল্পীর বেহালা শুনতে দাঁড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাটি তেমনই এক বিকেলের। শহরের পরিচিত কোলাহল ও ব্যস্ততার মাঝেও জেমস স্থির হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে তন্ময় হয়ে সেই তরুণের বাজনা শুনেছেন। শিল্পীর পরিচয় জানার চেষ্টা কিংবা নিজের পরিচয় দেওয়ার কোনো আয়োজন ছিল না সেখানে, কেবল সুরই ছিল একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। এই মুহূর্তটি যেন জেমসের সেই বিশ্বাসেরই দৃশ্যরূপ হয়ে উঠেছিল যে, সুরের কোনো সীমানা নেই, ভাষার কোনো বাধা নেই। পাশে থাকা সঙ্গীরাও নীরবে সেই দৃশ্য উপভোগ করেছেন, যেখানে একজন কিংবদন্তি শিল্পী আরেক অচেনা শিল্পীর সুরে মগ্ন হয়েছেন।

সিডনির বাণিজ্যিক এলাকার বিপণিবিতান ও বাজারেও জেমসকে দেখা গেছে একজন সাধারণ ক্রেতার মতো। তার সঙ্গে ছিল না কোনো বাড়তি নিরাপত্তা বা তারকাসুলভ আড়ম্বর। সহধর্মিণীর দেওয়া তালিকা দেখে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা থেকে শুরু করে নিজের পছন্দের সুগন্ধির খোঁজে শহরের একটি পুরোনো অভিজাত দোকানে ঢুঁ মারা – সবই তিনি করেছেন শান্ত ও ধীরস্থিরভাবে। সেখানে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, বরং সময় নিয়ে একের পর এক সুবাস পরখ করে পছন্দের সুগন্ধিটি কিনেছেন। দোকানের বিক্রেতা কিংবা আশপাশের ক্রেতাদের আচরণেও কোনো বাড়তি কৌতূহল দেখা যায়নি। তারা হয়তো বুঝতেই পারেননি যে, বাংলাদেশের রকসংগীতের অন্যতম প্রধান শিল্পী তাদের পাশেই একজন সাধারণ ক্রেতার মতো দাঁড়িয়ে আছেন।

সংগীতের বাইরে আলোকচিত্রের প্রতি জেমসের অনুরাগ বহু পুরোনো। সিডনিতেও ক্যামেরা ছিল তার নিত্যসঙ্গী। বিকেল হলেই তিনি কখনো আয়োজক বেঙ্গলি সিনে ক্লাবের তানিম মান্নান, প্রসেনজিৎ রায় ও সৈকত মণ্ডলের সঙ্গে, আবার কখনো দীর্ঘদিনের সঙ্গী আহসান এলাহী ফান্টি, গিটারিস্ট তালুকদার সাব্বির, ইশমামুল ফরহাদ, কিবোর্ডিস্ট আবদুল কাইয়ুম এবং ব্যবস্থাপক রুবাইয়াত ঠাকুরের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তেন। তাদের গন্তব্য ছিল কখনো হারবারের তীরে কিরিবিলি, কখনো বা অপেরা হাউস চত্বর। ট্রাইপড বসিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ছবি তুলেছেন—গোধূলির আলোয় হারবার ব্রিজ, পানির ঢেউয়ের ছন্দ কিংবা অপেরা হাউসের কোনো শান্ত কোণ—সবই ধরা পড়েছে তার ক্যামেরায়। ছবি তোলার সময় তাকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে তিনি নিছক বেড়াতে বেরিয়েছেন নাকি কোনো আলোকচিত্র প্রকল্পে কাজ করছেন; তার সম্পূর্ণ মনোযোগ ছিল কেবল ছবির ফ্রেমে।

কিরিবিলির ঘাটে ঘটেছিল একটি মজার ঘটনা। জেমস ও তার সঙ্গীরা নিজেদের একটি ছবি তুলে দেওয়ার জন্য এক অচেনা পথচারীকে অনুরোধ করেন। কাকতালীয়ভাবে সেই ভিনদেশি ব্যক্তিও ছিলেন একজন পেশাদার আলোকচিত্রী। ক্যামেরা হাতে নিয়েই তিনি জেমসকে নির্দেশ দিতে শুরু করেন, “এভাবে নয়, ওভাবে তাকান! চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, চোখ খুলুন!” জেমসকে এভাবে নির্দেশ দিতে দেখে তার সঙ্গীরা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেও, জেমসের মুখে বিরক্তির কোনো ছাপ ছিল না। বরং তিনি মিষ্টি হেসে আলোকচিত্রীর প্রতিটি নির্দেশ মেনে পোজ দিতে থাকেন এবং ঘটনাটি বেশ উপভোগও করেন। তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের ভাষায়, এমন নির্ভার ও প্রাণবন্ত জেমসকে খুব বেশি দেখা যায় না।

সিডনির পথে গাড়িতে ঘোরার সময় জেমস শুনছিলেন ফরাসি জ্যাজ। যদিও ভাষাটি তার জানা ছিল না, তবুও সুর ও আবেগে তিনি গভীরভাবে ডুবে ছিলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি জানান, সুরের কোনো ভাষা বা ভূগোল নেই; গানের ভাষা না বুঝলেও তার আবেগ সরাসরি মানুষের মনে পৌঁছে যেতে পারে। এই উপলব্ধি তার নিভৃতচারী ও গভীর সংবেদনশীল ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে, যেখানে শিল্পী কেবল মঞ্চে নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষণে শিল্পের বিভিন্ন দিক অন্বেষণ করেন। তার কাছে সংগীত কেবল ভাষার মাধ্যমে প্রকাশিত হয় না, বরং তা সার্বজনীন এক অনুভূতি, যা সরাসরি আত্মাকে স্পর্শ করে।

সিডনিতে জেমসের এই চার দিনের অভিজ্ঞতা তার বহুমুখী ব্যক্তিত্বের ওপর নতুনভাবে আলোকপাত করেছে। মঞ্চের ঝলমলে তারকা থেকে একজন শান্ত, নিভৃতচারী পর্যবেক্ষক, সুরানুরাগী এবং আলোকচিত্রী—এই ভিন্ন ভিন্ন রূপে জেমস তার ভক্তদের জন্য এক নতুন আবিষ্কার। তার এই ভ্রমণ কেবল স্থান পরিবর্তন ছিল না, বরং ছিল একজন শিল্পীর আত্মমগ্নতা ও প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রতিফলন। তারকাখ্যাতির আড়ালে থাকা এই বিনয়ী ও কৌতূহলী জেমস প্রমাণ করেছেন, শিল্পীর জীবন কেবল মঞ্চে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা জীবনের প্রতিটি কোণে, প্রতিটি ছোট ছোট মুহূর্তে ছড়িয়ে থাকে, যা তাকে আরও বেশি মানবিক ও আপন করে তোলে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ