বিশ্বজুড়ে সৌন্দর্য, মেধা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য মঞ্চ, ৭৩তম মিস ওয়ার্ল্ড ২০২৬-এর মুকুট উঠল ডমিনিকান রিপাবলিকের জোহেইরি মোলা দোমিঙ্গেসের মাথায়। এক জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই সম্মানজনক খেতাব অর্জন করেন তিনি। গত বছরের মিস ওয়ার্ল্ড বিজয়ী থাইল্যান্ডের ওপাল সুচাতা, ৭৩তম আসরের বিজয়ীকে মুকুট পরিয়ে দেন, যা ছিল এক আবেগঘন মুহূর্ত। এই জয় কেবল তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং ডমিনিকান রিপাবলিকের জন্যও এক গৌরবের বিষয়, যা বিশ্বমঞ্চে তাদের প্রতিনিধিত্বকে আরও উজ্জ্বল করেছে।
চূড়ান্ত পর্বে যখন ছয়জন সেরা প্রতিযোগীকে একে একে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি করা হচ্ছিল, তখন জোহেইরি মোলাকে এমন একটি প্রশ্ন করা হয় যা তার মেধা, মনন এবং সামাজিক অঙ্গীকারের গভীরতা পরীক্ষা করে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘আপনি আপনার দেশে কোন “বিউটি উইথ আ পারপাস” উদ্যোগটি নিয়েছেন? মিস ওয়ার্ল্ড নির্বাচিত হলে কীভাবে সেটি আরও ভালোভাবে করবেন?’ এই প্রশ্নটি প্রতিযোগিতার মূল দর্শনকে প্রতিফলিত করে, যেখানে শুধুমাত্র বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং একজন প্রতিযোগীর সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার ক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জোহেইরি মোলা দোমিঙ্গেস অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে তার ‘ভয়েস অব টুমোরো’ নামক উদ্যোগটির কথা তুলে ধরেন। এই কর্মসূচিটি সুবিধাবঞ্চিত এলাকার শিশুদের ইংরেজি ভাষা শেখানোর উপর কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। তার মতে, ইংরেজি ভাষা শেখার মাধ্যমে এই শিশুরা বিশ্বের বৃহত্তর সুযোগগুলোর সাথে পরিচিত হতে পারবে। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি নতুন ভাষা শেখা কেবল যোগাযোগের একটি মাধ্যম নয়, বরং এটি জ্ঞান আহরণ, নতুন সংস্কৃতিকে বোঝা এবং নিজেদের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
নিজের উত্তরকে আরও ব্যাখ্যা করে মোলা বলেন, ইংরেজি ভাষা জানার ক্ষমতা শিশুদের জন্য বড় বড় সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন যে, মিস ওয়ার্ল্ডের অন্য প্রতিযোগীদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি এই দক্ষতার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলছিলেন, কারণ এই ভাষাজ্ঞানের কারণেই তারা আজ এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। ইংরেজি তাদের নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে এবং তাদের মহৎ উদ্দেশ্যের কথা অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। এটি এমন একটি বৈশ্বিক ভাষা যা বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক সীমার মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ায়।
জোহেইরি মোলার কাছে ‘ভয়েস অব টুমোরো’ কেবল একটি প্রকল্প নয়, বরং এটি তার হৃদয়ে ধারণ করা একটি গভীর মানবিক প্রচেষ্টা। তিনি মনে করেন, এই কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি শিশুদের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা দিতে পারছেন যা তাদের সারা জীবন কাজে লাগবে। এই দক্ষতা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে, ভবিষ্যতের পথ সুগম করবে এবং তাদের নিজেদের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ করে দেবে। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে তিনি কেবল একজন সৌন্দর্য প্রতিযোগী নন, বরং একজন দূরদর্শী সামাজিক কর্মী, যিনি শিক্ষাকে পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখেন।
মোলা দোমিঙ্গেসের ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনও তার এই সামাজিক অঙ্গীকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন, যা তাকে সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নেতৃত্ব বিকাশে সহায়তা করেছে। বর্তমানে তিনি ইংরেজি সাহিত্য ও সামাজিক বিজ্ঞান পড়ান, যেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা এবং সামগ্রিক বিকাশে উৎসাহিত করেন। একজন শিক্ষিকা হিসেবে তিনি জানেন কিভাবে শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।
শিক্ষকতার পাশাপাশি, জোহেইরি ‘ইউনিভিশন নিউইয়র্ক’ পত্রিকার সংবাদদাতা হিসেবেও কাজ করেন। এই ভূমিকায় তিনি ডমিনিকান সংস্কৃতি, সামাজিক সমস্যা এবং বিভিন্ন কমিউনিটির গল্প তুলে ধরেন। তার এই সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তাকে সমাজের বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করেছে এবং তার সামাজিক উদ্যোগগুলোকে আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে প্রেরণা জুগিয়েছে। তার বহুমুখী প্রতিভা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে ৭৩তম মিস ওয়ার্ল্ডের মুকুট জেতার জন্য একজন যোগ্য প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জোহেইরি মোলা দোমিঙ্গেসের এই জয় বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। তার ‘বিউটি উইথ আ পারপাস’ উদ্যোগ এবং ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ক্ষমতায়নের বার্তাটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। মিস ওয়ার্ল্ড হিসেবে তার মেয়াদকালে তিনি নিঃসন্দেহে এই মহৎ উদ্দেশ্যকে আরও বিস্তৃত করবেন এবং বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য একজন শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবেন। তার জয় প্রমাণ করে যে সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক নয়, বরং তা মেধা, সহানুভূতি এবং সমাজের প্রতি গভীর অঙ্গীকারের সাথে মিশে থাকে।