ইতালির ভেনিসে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে বর্বরোচিত হেনস্তা ও হামলার শিকার হয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেত্রী সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দিনগত রাতে, বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী, নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিওবার্তার মাধ্যমে এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং তার ভক্তদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে, যা বিদেশে জন ব্যক্তিত্বদের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক আগ্রাসনের প্রকৃতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
বাঁধনের বিস্তারিত বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে যখন তিনি ভেনিসের একটি স্থানীয় পার্কে তার ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেখানেই একদল ব্যক্তি তাদের ওপর চড়াও হয়ে আকস্মিক হামলা চালায়। অভিনেত্রী অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা তার গায়ে কোক এবং ডিম ছোড়ে, যা তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। আরও গুরুতর বিষয় হলো, তার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলা হয়, যাতে তিনি ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে বা তাৎক্ষণিকভাবে সাহায্য চাইতে না পারেন। এই ধরনের আক্রমণ একটি সাধারণ পারিবারিক ভ্রমণকে ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করে।
হামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলে অভিনেত্রী সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। বাঁধনের দাবি, হামলাকারীরা তাকে ‘জুলাইযোদ্ধা’ আখ্যা দেয়, যা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মীদের হেয় করার জন্য ব্যবহৃত একটি শব্দ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো, হামলাকারীরা তাকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিতে বাধ্য করে এবং পুরো ঘটনাটি ভিডিও করে। এই দাবি এবং অকথ্য গালিগালাজ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, এই হামলা একটি পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ ছিল, যা একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।
ভিডিওবার্তায় বাঁধনকে অত্যন্ত বিচলিত ও আবেগপ্রবণ দেখা যায়। তিনি বলেন, “আমার গায়ে হাত তোলা হয়েছে। আমার ভাইয়ের স্ত্রীকেও ধাক্কা দেওয়া হয়েছে।” তার এই আহ্বান কেবল নিজের জন্য নয়, বরং এই ধরনের অসংলগ্ন ও সহিংস আচরণ থেকে বিরত থাকার জন্য বৃহত্তর সমাজের প্রতি একটি বার্তা ছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আপনাদের এ ধরনের অসংলগ্ন আচরণ থেকে বের হয়ে আসা উচিত। আপনারা এভাবে নিজেদের ফেরাতে পারবেন না।” এই কঠিন পরিস্থিতিতে, তিনি সরাসরি সজীব ওয়াজেদ জয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন, যিনি সে সময় ভেনিসেই অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে। বাঁধন তার বার্তাটি জয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান।
এই ঘটনা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, একদল ব্যক্তি নিজেদের ছাত্রলীগ কর্মী দাবি করে বাঁধনকে ‘জুলাই জঙ্গি’ আখ্যা দিচ্ছেন এবং তার ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করছেন। এই ভিডিওগুলো বাঁধনের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করে এবং ঘটনাটির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তোলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ভিডিওগুলো ভাইরাল হওয়ার পর থেকে নেটিজেনরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, অনেকেই এই ধরনের রাজনৈতিক গুন্ডামির নিন্দা জানিয়েছেন এবং অভিনেত্রীর জন্য ন্যায়বিচার দাবি করেছেন।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, আজমেরী হক বাঁধন বর্তমানে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ চলচ্চিত্রে তার অনবদ্য অভিনয় তাকে আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যাপক পরিচিতি ও প্রশংসা এনে দিয়েছে। এমন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী যখন দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তখন তার ওপর এই ধরনের হামলা কেবল তার ব্যক্তিগত সম্মানহানিই নয়, বরং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করে, বিশেষত যখন কথিত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে।
এই অত্যন্ত উদ্বেগজনক ঘটনাটির পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত পছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে কোনো ব্যক্তিকেই শারীরিক নির্যাতন, মৌখিক অপমান বা জোরপূর্বক রাজনৈতিক স্লোগান দিতে বাধ্য করা উচিত নয়। হামলাকারীরা নিজেদের একটি প্রধান রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের কর্মী দাবি করায় বিষয়টির জটিলতা ও গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ এবং ইতালির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে অপরাধীদের চিহ্নিত করা এবং তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রত্যাশিত, যাতে আইনের শাসন বজায় থাকে এবং নাগরিকদের, বিশেষ করে যারা দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাদের অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষিত থাকে। সাংস্কৃতিক মহল এবং সুশীল সমাজ এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার একটি সঠিক নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।