বাংলাদেশের অভিনয় জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, বর্ষীয়ান অভিনেত্রী দিলারা জামান, সম্প্রতি তার পেশাগত জীবন এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। তার মতে, অভিনয় কেবল একটি পেশা নয়, এটি চরিত্রকে নিজের সত্তায় ধারণ করার এক গভীর প্রক্রিয়া। একজন প্রকৃত শিল্পী তখনই সফল হন, যখন তিনি প্রতিটি চরিত্র ও সংলাপকে নিজের অনুভূতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশিয়ে নিতে পারেন, যা তাকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলে। এই আত্মস্থ করার প্রক্রিয়াটিই একজন শিল্পীকে তার কাজের প্রতি প্রকৃত নিষ্ঠা ও ভালোবাসা অর্জনে সাহায্য করে।
সম্প্রতি একটি কাজের শুটিং সেটে প্রকৃতির মাঝে বসে দিলারা জামান তার এই উপলব্ধি ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, শিল্পীর মন ভেতরের সমস্ত অনুভুতিকে ধারণ করতে না পারলে শিল্পী হিসেবে পূর্ণতা আসে না। প্রতিটি সংলাপ বা চরিত্রকে নিজের ভেতরে আত্মস্থ করে নিতে হয়। এই ধারণক্ষমতা এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতাই একজন অভিনেতাকে সাধারণ থেকে অসাধারণ করে তোলে। তার দীর্ঘ অভিনয় জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, এই নিবেদনই তাকে দর্শকের কাছে স্মরণীয় করে রেখেছে এবং ভবিষ্যতেও রাখবে।
ব্যক্তিগত জীবনের প্রসঙ্গে তিনি জানান, ঢাকায় তার নিজস্ব কোনো জমি নেই। অনেক সংগ্রাম করে তিনি একটি ছোট ফ্ল্যাট কিনতে পেরেছিলেন। একসময় সেই ফ্ল্যাটের চারপাশ উন্মুক্ত এবং খোলামেলা থাকলেও, সময়ের পরিক্রমায় একের পর এক বহুতল ভবন গড়ে ওঠায় সেটি এখন আলো-বাতাসহীন হয়ে পড়েছে। চারপাশের অগণিত কংক্রিটের জঙ্গল তার ছোট ফ্ল্যাটটিকে প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলেছে, যেখানে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো বা বিশুদ্ধ বাতাস প্রবেশ করে না। এই পরিস্থিতি তার দৈনন্দিন জীবনকে অনেকটাই প্রভাবিত করে।
এই শহুরে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান যখন তিনি শুটিংয়ের জন্য কোনো খোলা পরিবেশে বা প্রকৃতির কাছাকাছি আসেন। দিলারা জামান বলেন, "যখন আমি শুটিংয়ে এরকম খোলা পরিবেশের মধ্যে, প্রকৃতির মাঝে আসি, তখন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারি না। বসে থাকি বাইরে। সবাই বলে ঘরে যান, ঘরে যান। আমি বলি, আমাকে একটু বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে দাও।" এই কথাগুলো তার ভেতরের গুমোটভাব এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রতিফলন। এই খোলা জায়গাগুলো তাকে কেবল শারীরিক নয়, মানসিক সজীবতাও দান করে, যা তার অভিনয় সত্তাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
বর্তমানে বয়স এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে দিলারা জামান আগের মতো নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। তবুও ভালো কাজের প্রতি তার আগ্রহ বিন্দুমাত্র কমেনি। তিনি মনে করেন, প্রত্যেক শিল্পীর মন ভালো কাজের জন্য হাহাকার করে, যেন এক দুর্ভিক্ষের মানুষের মতো আকুতি জানায়। তারও একই অবস্থা। শরীর সায় না দিলেও, তিনি চান একটি ভালো কাজের মাধ্যমে দর্শকের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে। একটি স্মরণীয় চরিত্র বা কাজ তাকে অমর করে রাখবে, এই বিশ্বাস তার মধ্যে প্রবল।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে নিজের সততার কথাও জোর দিয়ে বলেন এই প্রবীণ অভিনেত্রী। তিনি বলেন, "আমি যেটুকু কাজ করি, আমি সততার সঙ্গে করি, আমি কাউকে কষ্ট দিই না।" তিনি আরও যোগ করেন যে, পরিচালক যতক্ষণ সন্তুষ্ট না হন, তিনি ততবার কাজ করতে প্রস্তুত। সেখানে কোনো আপস বা সমঝোতার স্থান নেই। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি সবসময় পেশার প্রতি সৎ ও একনিষ্ঠ থাকার চেষ্টা করেছেন। তার মতে, যেকোনো কাজে সততা, পরিশ্রম ও চেষ্টা অপরিহার্য। সামান্য প্রশংসায় নিজেকে অনেক বড় মনে করলে শিল্পী হিসেবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, বরং তা উন্নতির পথ রুদ্ধ করে দেয়।
দিলারা জামান মনে করেন, অভিনয়ে শেখার কোনো শেষ নেই। প্রতিটি দিনই নতুন কিছু শেখার সুযোগ নিয়ে আসে। বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীরা যেমন আগের প্রজন্মের কাছ থেকে শিখছেন, তেমনি তিনি নিজেও নতুনদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখেন। এই পারস্পরিক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান শিল্পের ধারাকে সচল রাখে এবং সমৃদ্ধ করে। এটি কেবল একমুখী প্রক্রিয়া নয়, বরং উভয়ের জন্য উপকারী।
বর্তমান সময়ের শিল্পীদের প্রযুক্তির কারণে অনেক বেশি সুযোগ রয়েছে বলেও মনে করেন এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী। তিনি বলেন, "এখন যারা কাজ করে, আমি বলব তারা অনেক ভাগ্যবান। কারণ এই প্রযুক্তির কারণে তারা অনেক কিছু শিখতে পারে, জানতে পারে। আমাদের সময়ে সে সুযোগটা ছিল না।" তিনি আশা করেন, নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা এই আধুনিক সুযোগ-সুবিধাগুলো কাজে লাগিয়ে আরও ভালো কাজ করবে এবং তাদের চেয়েও উন্নত মানের শিল্পকর্ম উপহার দেবে। তার এই মন্তব্য নতুন প্রজন্মের প্রতি তার আস্থা ও শুভকামনার পরিচায়ক।