বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের বর্তমান সংকটকে সাময়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে এবং নেতিবাচক প্রচারণা মোকাবিলায় কূটনৈতিক তৎপরতাকে আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএএমইএ) সভাপতি মো. শাহরিয়ার। তিনি মনে করেন, পোশাকশিল্প নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে যে উদ্বেগ ও ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তা নিরসনে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও বিজনেস উইংগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
মো. শাহরিয়ার জোর দিয়ে বলেন, বায়ারদের কাছে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে, প্রতিযোগী দেশগুলো থেকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প সম্পর্কে যে ভুল বা নেতিবাচক তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তার যথাযথ ও সময়োপযোগী জবাব দেওয়া আবশ্যক। বাংলাদেশের সোর্সিং সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে ক্রেতাদের আস্থা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক মিশনগুলোর কার্যকর ও সমন্বিত ভূমিকা এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিপিএএমইএ সভাপতি ক্রেতাদের উদ্দেশে আরও বলেন যে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকরা সব সময় ক্রেতাদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালনে বদ্ধপরিকর। অতীতে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে বড় ধরনের কোনো সমস্যা সৃষ্টি হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, সরকার ও এই খাতের মালিকরা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, যার ফলস্বরূপ বাংলাদেশ তাদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভরযোগ্য সোর্সিং হাব হিসেবে টিকে থাকবে।
বর্তমানে বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং এর ফলে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে যে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ও কার্যাদেশ হ্রাসের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা অ্যাক্সেসরিজ, ট্রিমস ও প্যাকেজিং শিল্পেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। মো. শাহরিয়ার উল্লেখ করেন, বিশ্ববাজারে পোশাক পণ্যের অর্ডারের এই পরিস্থিতি কিছুটা উদ্বেগের কারণ। সাধারণত, গার্মেন্টসের অর্ডার নিশ্চিত হওয়ার আগেই অ্যাক্সেসরিজ ও প্যাকেজিংয়ের বিষয়টি বায়াররা চূড়ান্ত করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ নিয়ে অধিকাংশ বায়ারের মধ্যেই কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যা মূলত গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক খবরের ফল। প্রতিযোগী দেশগুলো থেকে এই নেতিবাচক প্রচারণা বায়ারদের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে এবং তারা তাদের নিজস্ব দূতাবাস ও বিজনেস উইংয়ের কাছ থেকেও এসব বিষয়ে তথ্য যাচাই করছেন।
তবে, বিপিএএমইএ সভাপতি ক্রেতাদের আশ্বস্ত করে বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা গেলেও পোশাকশিল্পের সঙ্গে সাধারণ মানুষের ব্যাপক সম্পৃক্ততার কারণে সরকার সবসময়ই এই খাতকে বিশেষ যত্ন ও সুরক্ষা দিয়ে এসেছে। এ কারণে অতীতেও এই খাতে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমস্যা হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
মো. শাহরিয়ার পোশাকশিল্পের সঙ্গে অ্যাক্সেসরিজ শিল্পের গভীর আন্তঃসম্পর্ক ব্যাখ্যা করে বলেন, পোশাকশিল্পে সমস্যা দেখা দিলে পোশাকের উপকরণ প্রস্তুতকারকরাও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন। পোশাক কারখানায় ক্রয়াদেশ কমে গেলে পোশাক উৎপাদন হ্রাস পায় এবং বোতাম, জিপার, লেবেল, প্যাকেটসহ বিভিন্ন উপকরণের চাহিদাও কমে যায়। এর ফলস্বরূপ, উপকরণ প্রস্তুতকারকদের বিক্রি ও আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এছাড়াও, পোশাক কারখানাগুলো আর্থিক সংকটে পড়লে উপকরণ সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধে দেরি হতে পারে, যা উপকরণ প্রস্তুতকারকদের নগদ অর্থের প্রবাহে মারাত্মক সমস্যা তৈরি করে। অন্যদিকে, কাঁচামাল, বিদ্যুৎ ও শ্রমের ব্যয় ক্রমাগত বাড়লেও কম দামে পণ্য সরবরাহের চাপ থাকায় তাদের মুনাফার মার্জিন সংকুচিত হয়ে আসে। তাই পোশাকশিল্প ও পোশাকের উপকরণ শিল্প একে অপরের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, পোশাকশিল্পে সংকট হলে এর প্রভাব সরাসরি উপকরণ প্রস্তুতকারকদের বিক্রি, আয়, উৎপাদন ও বিনিয়োগের ওপর পড়ে।
ক্রেতাদের বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে নেওয়ার কারণ সম্পর্কে মো. শাহরিয়ার বলেন, ক্রেতাদের যারা অর্ডার বা নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন, তারা মূলত চাকরিজীবী। তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাওয়া এবং তাদের স্টোর শেল্ফ খালি না থাকা। কোনো কারণে বাংলাদেশ থেকে পণ্য সরবরাহে সমস্যা হলে তাদের চাকরিও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই প্রয়োজনে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি দাম দিয়েও তারা অন্য দেশ থেকে পণ্য নিতে দ্বিধা করেন না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, তারা শুধু সাময়িকভাবে অর্ডার সরাচ্ছেন না, একই সঙ্গে নতুন নতুন সোর্সিং দেশও তৈরি করছেন, যা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এই প্রবণতা ঠেকাতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য।