সোমবার, 14 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
বাণিজ্য 🇧🇩 বাংলা

বেনাপোল বন্দরে আসছে ভারত-মিয়ানমারের ইলিশ: ৫০০ টাকার মাছ বিক্রি হচ্ছে ১৮০০ টাকায়, ক্রেতারা প্রতারিত

বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে বিপুল পরিমাণ ইলিশ আমদানি হচ্ছে। এসব ইলিশ ৫০০ টাকা কেজি দরে কেনা হলেও দেশের বিভিন্ন বাজারে ১৪০০-১৮০০ টাকায় 'পদ্মার ইলিশ' পরিচয়ে বিক্রি করা হচ্ছে, যা ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক প্রতারণার জন্ম দিচ্ছে। গত দুই মাসে তিন লাখ ৫২ হাজার কেজি ইলিশ আমদানির তথ্য মিলেছে।

শেয়ার করুন:
বেনাপোল বন্দরে আসছে ভারত-মিয়ানমারের ইলিশ: ৫০০ টাকার মাছ বিক্রি হচ্ছে ১৮০০ টাকায়, ক্রেতারা প্রতারিত

বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ ইলিশ দেশের বিভিন্ন বাজারে ‘পদ্মার ইলিশ’ পরিচয়ে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মাত্র ৫০০ টাকা কেজি দরে কেনা এসব বিদেশি ইলিশ ক্রেতাদের কাছে ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকায় বিক্রি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের মুনাফা। এতে একদিকে যেমন ক্রেতারা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, তেমনি দেশের ঐতিহ্যবাহী ইলিশের সুনামও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। গত দুই মাসে বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কেজি ইলিশ আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে, যা এই প্রতারণার চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

কাস্টমস ও ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস, অর্থাৎ জুলাই ও আগস্ট মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে মোট তিন লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই মাসে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি এবং আগস্ট মাসে তিন লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি ভারতীয় ইলিশ দেশে প্রবেশ করেছে। আমদানি করা এসব ইলিশের মোট মূল্য দেখানো হয়েছে ছয় কোটি ৯২ লাখ টাকা। জুলাইয়ের আমদানি মূল্য ছিল ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৬ টাকা এবং আগস্টের জন্য ছয় কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ টাকা। ফেমাস ট্রেডার্স, সততা ফিস ফিড, শরীফ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, স্বর্ণালী ইন্টারন্যাশনাল, রাব্বি এন্টারপ্রাইজসহ মোট ২২ জন আমদানিকারক এই বিপুল পরিমাণ মাছ আমদানি করেছেন।

আমদানিকৃত ইলিশের দাম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এলসির মাধ্যমে ভারত থেকে আনা প্রতি কেজি ইলিশের দাম পড়ছে ২৫২ টাকা। এর সঙ্গে সরকারি শুল্ক বাবদ ১৬২ টাকা, ট্রাক ভাড়া, এলসি খরচ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজিতে আরও ১০০ টাকা যোগ হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রতি কেজি ইলিশের মোট দাম দাঁড়ায় প্রায় ৫১৪ টাকা। অথচ এই মাছই দেশের বিভিন্ন বাজারে ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা আমদানি মূল্যের প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন গুণ বেশি। এই বিশাল দামের তারতম্যই অসাধু ব্যবসায়ীদের এমন প্রতারণামূলক কার্যকলাপে উৎসাহিত করছে।

কেবল বাংলাদেশেই নয়, পশ্চিমবঙ্গের বাজারগুলোতেও টন টন গুজরাট, মুম্বাই ও মিয়ানমারের ইলিশ প্রবেশ করছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে, ‘স্বাদ ও গন্ধহীন’ এসব বিদেশি মাছকে বাংলাদেশের সুস্বাদু ইলিশ বলে পরিচয় দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। ক্রেতারা বাজারে গিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ছেন। তারা ‘বাংলাদেশি পদ্মার ইলিশ’ মনে করে এসব মাছ কিনলেও, বাড়িতে নিয়ে রান্নার পর বুঝতে পারছেন যে, মাছটিতে দেশি ইলিশের সেই পরিচিত স্বাদ ও গন্ধ নেই। বিদেশি ইলিশ দেখতে দেশি ইলিশের মতোই হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে এর পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী এসব মাছকে ‘রোহিঙ্গা ইলিশ’ নামেও প্রচার করছেন।

বাংলাদেশের বাজারে দেশি ইলিশের চাহিদা বরাবরই আকাশচুম্বী এবং এর দামও তুলনামূলকভাবে বেশি। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ভারত ও মিয়ানমার থেকে ইলিশ আমদানি করে তা ‘পদ্মার ইলিশ’ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম জানান, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে তিন লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে এবং ২২ জন আমদানিকারক এসব মাছ এনেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তারা মাছ ভালোভাবে পরীক্ষা করেই কোয়ারেন্টাইন সার্টিফিকেট প্রদান করছেন।

মাছ ব্যবসায়ীদের একাংশ বলছেন, ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও মিয়ানমারের এসব মাছ ভারত হয়ে বেনাপোল বন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। তবে বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য ভিন্ন। তাদের মতে, বেনাপোল দিয়ে আসা ইলিশ মূলত ভারতীয় ইলিশ। মিয়ানমার থেকে যে ইলিশ আসছে, সেগুলো সাধারণত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। এর পাশাপাশি একটি সূত্র দাবি করেছে যে, অনেক ইলিশ অবৈধভাবেও দেশে আসছে। গত ২২ জুলাই বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সাদা মাছের ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা প্রায় ৩৬০ কেজি ভারতীয় ইলিশ মাছ জব্দ করে বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, যা অবৈধ আমদানির ইঙ্গিত দেয়।

বেনাপোল বাজারে ইলিশ কিনতে আসা মো. মহিউদ্দিনের মতো অনেক ক্রেতাই এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তিনি জানান, দেশি ইলিশ মনে করে একটি মাছ কিনেছিলেন, কিন্তু খাওয়ার পর বুঝতে পারেন মাছটির স্বাদ ও গন্ধ দেশি ইলিশের মতো নয়। তার অভিযোগ, দেখতে প্রায় একই হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে বিদেশি ও দেশি ইলিশের পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত কঠিন। আরেক ক্রেতা আনোয়ারুল ইসলামও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, বাজারের অসাধু ব্যবসায়ীরা বিদেশি ইলিশকে দেশি ইলিশ বলে বিক্রি করে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন।

এই পরিস্থিতি দেশের ইলিশ বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে এবং ভোক্তাদের আস্থায় চিড় ধরিয়েছে। দেশি ইলিশের বিপুল চাহিদা ও উচ্চ মূল্যের সুযোগ নিয়ে বিদেশি, কম স্বাদের ইলিশকে দেশি বলে চালিয়ে দেওয়া এক গুরুতর সমস্যা। ক্রেতাদের সচেতনতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপই কেবল এই প্রতারণা বন্ধ করতে পারে এবং ঐতিহ্যবাহী পদ্মার ইলিশের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ