ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার পশ্চিমাঞ্চলে একটি বহুতল আবাসিক ভবন ধসে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অন্তত ১১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারী ও শিশুও রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা এবং ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানিয়েছে, ধসে পড়া ভবনটির ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অন্তত ছয়টি পরিবার আটকা পড়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইসরায়েলি হামলায় ভবনটি পূর্বে ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলে স্থানীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, যা এই মর্মান্তিক ধসের অন্যতম কারণ হতে পারে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাতে গাজা শহরের পশ্চিমাংশে এই ঘটনা ঘটে এবং বুধবার সকাল পর্যন্তও ব্যাপক উদ্ধার কার্যক্রম চলমান ছিল। আল-জাজিরার মাধ্যমে যাচাইকৃত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, উদ্ধারকারীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে শিশুদের বের করে আনছেন। বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও স্বেচ্ছায় উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন। তবে, পর্যাপ্ত ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের হাত দিয়ে কংক্রিট ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর চেষ্টা করতে দেখা গেছে, যা উদ্ধার কার্যক্রমকে অত্যন্ত ধীর ও কঠিন করে তুলেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বর্ণনা করেছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে শিশুদের সাহায্যের জন্য তীব্র চিৎকার শোনা যাচ্ছিল, যা উপস্থিত সকলের হৃদয় বিদারক করে তোলে। কংক্রিটের বিশাল স্তূপ এবং লোহার জালের নিচে আটকা পড়া ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছাতে বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মীদের প্রচণ্ড বেগ পেতে হয়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান, কিন্তু প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে উদ্ধারকাজে বিলম্ব হওয়ায় আটকে পড়াদের জীবন আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। গাজার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই ধরনের অবকাঠামোগত বিপর্যয় প্রায়শই ঘটে থাকে, যা এখানকার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে।
উদ্ধার কার্যক্রমের এক পর্যায়ে, আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায় যে, ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি শিশুকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হচ্ছে। এছাড়া, আরও বেশ কয়েকজন মানুষকে, যাদের মধ্যে শিশুরাও ছিল, ধ্বংসাবশেষের নিচ থেকে বের হয়ে আসতে দেখা যায়। শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগতে থাকা এসব আহত ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে সরিয়ে নেওয়া হয়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ঠিক কতজন আহত হয়েছেন, সে সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে আহতদের ভিড় বাড়ছে এবং তাদের জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হচ্ছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, ধসে পড়া ভবনটি এর আগে ইসরায়েলি বোমা হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওই হামলার পর ভবনটির বিভিন্ন অংশে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয় এবং এর কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকট হয়ে ওঠে। তবে, মঙ্গলবার রাতে ভবন ধসের সরাসরি কারণ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো স্বাধীন সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ দ্বারা নিশ্চিত করা যায়নি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকেও এই ঘটনা নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি, যা পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদানে জটিলতা সৃষ্টি করছে।
গাজায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে হাজার হাজার বাড়ি এবং অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। এসব ভবনের অনেকগুলো এখন বসবাসের অনুপযোগী এবং যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া বহু ফিলিস্তিনি বাধ্য হয়ে এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অথবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছেন, যা তাঁদের জীবনকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং অনিরাপদ বাসস্থান সেখানকার মানুষের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, ভবন মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী গাজায় প্রবেশে ইসরায়েলের বিধিনিষেধ রয়েছে। একই সঙ্গে, ধ্বংসস্তূপ সরানোর জন্য বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর কাছে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতিরও তীব্র ঘাটতি রয়েছে। এই দুটি প্রধান কারণে ভবন ধসে পড়ার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধারকারীদের অনেক সময় হাত দিয়েই ধ্বংসাবশেষ সরাতে হচ্ছে, যা আটকে থাকা মানুষদের কাছে পৌঁছাতে অনেক বেশি সময় লাগাচ্ছে। এই সীমাবদ্ধতাগুলো মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি করছে।
এই ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজের ধীরগতি এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। গাজা উপত্যকার বাসিন্দারা এমনিতেই দীর্ঘদিনের অবরোধ ও সংঘাতের কারণে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নির্মাণসামগ্রীর অভাব এবং জরুরি সেবার অপ্রতুলতা এখানকার মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং মানবিক সহায়তা এখন গাজার মানুষের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের বিপর্যয় এড়ানো যায় এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জীবন বাঁচানো যায়।