বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এক ঐতিহাসিক রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ৭ জন শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছেন। দণ্ডিতদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল। এছাড়া, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকেও একই দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। আদালত একইসঙ্গে এই ৭ আসামির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তার মধ্য থেকে ৫০ শতাংশ 'জুলাই শহীদ'-এর পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, যা ন্যায়বিচারের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। বেলা ১২টা ১০ মিনিট থেকে রায় ঘোষণা শুরু হয়ে প্রায় ৩০ মিনিট ধরে চলে, যেখানে মোট ৫৫৭ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পাঠ করেন চেয়ারম্যান। রায় ঘোষণার শুরুতেই ট্রাইব্যুনাল ওবায়দুল কাদেরের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন এবং পর্যায়ক্রমে বাকি আসামিদের বিরুদ্ধেও একই রায় প্রদান করা হয়। এই মামলার সকল আসামিই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন, যা বিচারিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আদালতের রায়ে স্পষ্টত উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এই অপরাধগুলো সংঘটিত হয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে, যা দেশের ইতিহাসে এক tumultuous অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। ট্রাইব্যুনাল মনে করেন, এই ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তিই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে এবং সমাজে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন জঘন্য কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার সাহস না পায়। পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকর করার বিষয়ে রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এর আগে গত ১৭ আগস্ট উভয় পক্ষের শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম এবং গাজী এমএইচ তামিম। তাঁরা আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ চেয়ে আদালতের কাছে আবেদন জানান। অন্যদিকে, আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আইনজীবী এম হাসান ইমাম এবং আইনজীবী ইসরাত জাহান। তাঁরা আসামিদের নির্দোষ দাবি করে খালাস চেয়েছিলেন। আইনজীবী এম হাসান ইমাম ওবায়দুল কাদের, নাছিম ও আরাফাতের পক্ষে শুনানি করেন, আর ইসরাত জাহান ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সভাপতি-সম্পাদকের পক্ষে আইনি লড়াই করেন। উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন এবং শুনানি দীর্ঘ সময় ধরে চলে, যেখানে প্রতিটি অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়।
ট্রাইব্যুনালের এই রায় শুধু আসামিদের শাস্তি প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং 'জুলাই শহীদ'-এর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। দণ্ডিত ৭ আসামির বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির ৫০ শতাংশ 'জুলাই শহীদ'-এর পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশ দেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার ব্যক্তি বা তাদের পরিবারকে শুধু ন্যায়বিচার প্রদানই নয়, আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নয়নেও রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ। এই পদক্ষেপ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই রায় বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে, যখন দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তখন তা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অঙ্গীকারকেই তুলে ধরে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই রায় ভবিষ্যতে এ ধরনের যেকোনো গণআন্দোলনের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে একটি শক্তিশালী বার্তা দেবে। দেশজুড়ে এই রায় ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তবে অধিকাংশ মানুষই এটিকে ন্যায়বিচারের জয় হিসেবে দেখছেন।
আদালতের এই রায় দেশের রাজনীতি এবং বিচার ব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এটি সমাজে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বাড়াতে এবং ভবিষ্যতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার আগে দুবার চিন্তা করতে উৎসাহিত করবে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এই রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তা দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বৃদ্ধি করবে। সামগ্রিকভাবে, এই রায় ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের এক শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ।