গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামে সাংস্কৃতিক কর্মীদের অপরিহার্য ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ফ্যাসিস্টদেরও নিজস্ব সাংস্কৃতিক দল ও সাংস্কৃতিক কর্মী থাকে। তিনি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন, একটি গান বা একটি ছোট সুরের শক্তি সমাজে বা রাষ্ট্রে সুনামির চেয়েও বেশি তরঙ্গ তৈরি করতে পারে, যা কয়েকটি অ্যাটম বোমার চেয়েও ভয়াবহ হয়ে স্বৈরতন্ত্রকে কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম। গত সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) আয়োজিত “একজন নেতার কথা বলছি” শীর্ষক একটি গানের সিডির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রুহুল কবির রিজভী তার বক্তব্যে সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির গভীর প্রভাবের ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, “বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা...” অথবা “দেশটা তোমার বাপের নাকি...”—এই ধরনের একটি গান বা কলি যে কোনো সমাজে বা রাষ্ট্রে এক বিশাল ঢেউ তৈরি করার ক্ষমতা রাখে। উদাহরণ হিসেবে তিনি আসামের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে কট্টরপন্থি সরকারের আমলে একটি গানের কারণে একজন শিল্পীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এই ঘটনা শিল্প ও শিল্পীর স্বাধীনতা হরণের পাশাপাশি তাদের শক্তির এক প্রচ্ছন্ন হুমকির ইঙ্গিত বহন করে। তার মতে, একজন শিল্পীর কণ্ঠস্বর স্বৈরাচারী শাসকদের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক হতে পারে।
বিএনপির এই শীর্ষ নেতা সাংস্কৃতিক কর্মীদের যেকোনো রাজনৈতিক আন্দোলন বা বিপ্লবের “মূল সৈনিক” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, “সাংস্কৃতিক কর্মী বাহিনী যেই রাজনৈতিক দল বা আন্দোলনে থাকবে না, সেই আন্দোলন কখনোই সফল হবে না।” পৃথিবীর ইতিহাসে প্রতিটি বৃহত্তর স্বাধীনতার সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সাংস্কৃতিক বাহিনী অগ্রগামী ও অগ্রসেনানী হিসেবে কাজ করেছে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, যদি তারা সুসংগঠিত না থাকে, তাহলে কোনো আন্দোলনই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। সাংস্কৃতিক কর্মীরা কেবল বিনোদন নয়, বরং আদর্শ ও চেতনার বাহক হিসেবে কাজ করেন, যা গণমানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলনের পথে চালিত করে।
ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থাতেও সাংস্কৃতিক দলের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, হিটলারের নাৎসি বাহিনী এবং মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট শাসনামলেও বড় বড় সাংস্কৃতিক কর্মী ও শিল্পী ছিল। তবে তিনি সতর্ক করে দেন যে, শিল্পী হলেই যে তিনি মানবতাবাদী হবেন এমনটা নয়। তার মতে, সত্যিকারের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তারাই, যাদের মধ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতো উদারতা ও মানবিক গুণাবলি রয়েছে। নজরুল ছিলেন আপসহীন ও প্রতিবাদী চেতনার প্রতীক, যার শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য ও মানবিক মূল্যবোধ একজন প্রকৃত শিল্পীর পরিচয় বহন করে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নির্দিষ্ট কিছু সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। তিনি সরাসরি রোকেয়া প্রাচী ও হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রীর নাম উল্লেখ করে বলেন, তারা শেখ হাসিনার গুণগান গাইছেন এবং বহু চক্রান্তের মধ্যে জড়িত হচ্ছেন। রিজভী মন্তব্য করেন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হলেই যে তার মন উদার ও মানবতাবাদী হবে, তা কিন্তু নয়। তার এই মন্তব্য দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চলমান বিভাজন এবং পক্ষপাতের প্রতি ইঙ্গিত করে।
বিএনপির এই নেতা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করে বলেন, আহনাফ, মুগ্ধ, আবু সাঈদ-এর মতো তরুণদের আত্মদান, তাদের শরীর থেকে রক্ত ঝরানো, সাদা শার্ট রক্তে লাল হওয়া—এসব দৃশ্য অনেকেই চোখে দেখেনি। তিনি অভিযোগ করেন, যারা এসব উপেক্ষা করে একটি “ভয়ঙ্কর ফ্যাসিস্টকে” সহযোগিতা করছেন, তারা কত বদ্ধ ও কত সঙ্কীর্ণ মানসিকতার অধিকারী। তাদের এই আচরণ একই দেশের মানুষ হয়েও চরম উদাসীনতার পরিচায়ক, যা জাতীয় ঐক্য ও সংহতির পরিপন্থী বলে তিনি মনে করেন।
জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)-এর যুগ্ম আহ্বায়ক ও গীতিকার-সুরকার ইথুন বাবুর সভাপতিত্বে এবং জাসাসের সদস্য খালেদ এনাম মুন্নার পরিচালনায় এই মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিএনপির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জল, সংসদ সদস্য শাম্মী আক্তার এবং শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন প্রমুখ। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সংস্কৃতির গুরুত্ব এবং এর প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।