প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং বজ্রপাতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় ঝিনাইদহে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিবেশকর্মী জহির রায়হানের অভিনব উদ্যোগে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে হাজার হাজার তাল বীজ রোপণ করা হয়েছে। এই মহতী কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো প্রাকৃতিক উপায়ে বজ্রপাত প্রতিরোধ করা এবং পরিবেশকে সবুজে ভরে তোলা, যা বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
সর্বশেষ গত ৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নের চন্ডিপুর-বেড়াশুলা মাঠে প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ মেঠোপথের দুই ধারে প্রায় সাড়ে পাঁচশ' তাল বীজ রোপণ করা হয়। এই কর্মসূচিতে তরুণ থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী এবং বিভিন্ন বয়সের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। স্থানীয় কৃষক, শিক্ষক ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি এই পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে এক উৎসবমুখর রূপ দিয়েছিল। উদ্যোক্তারা জানান, শুধু এই একটি স্থানেই নয়, বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রায় দশ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে এ পর্যন্ত অন্তত সাত হাজার তাল বীজ রোপণ করা হয়েছে, যা পরিবেশ সুরক্ষায় জহির রায়হানের নিবেদিত প্রচেষ্টারই অংশ।
পরিবেশকর্মী জহির রায়হান নিয়মিতভাবে তরুণদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন সড়কের পাশে তাল বীজ রোপণ করে থাকেন। তাল বীজ রোপণের পাশাপাশি তিনি অন্যান্য জাতের বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ কর্মসূচিও পরিচালনা করেন। তার এই নিরন্তর প্রচেষ্টা স্থানীয় জনসাধারণকে পরিবেশ রক্ষায় অনুপ্রাণিত করছে এবং একটি সবুজ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তার মতে, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে প্রত্যেকেরই সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করা উচিত এবং এই উদ্যোগ তারই একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র।
সরেজমিনে শংকরপুর চন্ডিপুর মাঠে তাল বীজ রোপণ কার্যক্রম পরিদর্শনকালে দেখা যায় এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। সেখানে তরুণ, মধ্যবয়সী থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ দলবেঁধে কাজে অংশ নিয়েছেন। কেউ পাটকাঠি দিয়ে গাছের সঠিক দূরত্বের মাপ নিচ্ছেন, কারও হাতে কোদাল মাটি খোঁড়ার কাজে ব্যস্ত, আবার কেউ তালবীজ বোঝাই ভ্যানগাড়ি ঠেলে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিচ্ছেন। সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পুরো দুই কিলোমিটার পথ জুড়ে সারিবদ্ধভাবে তালবীজ রোপণ করা হয়, যা এক অসাধারণ সামাজিক সংহতির উদাহরণ তৈরি করে।
পথচারী একরামুল কবির জহির রায়হানের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “বৃক্ষনিধনের এই যুগে জহির রায়হানের এমন প্রকৃতিপ্রেম সত্যিই এক দারুণ দৃষ্টান্ত।” তিনি আরও যোগ করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় এবং একটি সবুজ পৃথিবী গড়তে জহির রায়হানের এই মহতী উদ্যোগকে অনুসরণ করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তার মতে, এমন উদ্যোগগুলোই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে।
স্থানীয় সমাজসেবক নাহিদ হোসেন তালগাছের বহুমুখী উপকারিতার কথা উল্লেখ করে জানান, “তালগাছ বড় হলে আমরা তীব্র রোদে ছায়া পাবো। ফল ও রস খেতে পারব। এছাড়া, বজ্রপাত থেকেও তাল গাছ আমাদের রক্ষা করতে সহায়ক হবে।” তার এই মন্তব্য তালগাছের পরিবেশগত এবং ব্যবহারিক গুরুত্বকে তুলে ধরে, যা এই রোপণ কর্মসূচির তাৎপর্য আরও বাড়িয়ে তোলে। তালগাছ শুধু বজ্রপাত প্রতিরোধই নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি, পাখির আবাসস্থল তৈরি এবং মাটির ক্ষয়রোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জহির রায়হান তার এই উদ্যোগের পেছনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে বলেন, “বজ্রপাতে যেন কৃষকের প্রাণহানি না হয়, সেই লক্ষ্যে আমার সাধ্য অনুযায়ী এ কর্মসূচি পালন করছি।” তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করা প্রত্যেকেরই কর্তব্য। তার এই মানবিক এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ কেবল ঝিনাইদহ নয়, সমগ্র দেশের জন্য একটি অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা পরিবেশ সুরক্ষায় ব্যক্তিগত এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্বকে পুনর্বার প্রমাণ করে।
এই ধরনের জনহিতকর কর্মসূচিগুলো কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে পারে। জহির রায়হানের মতো পরিবেশকর্মীদের উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য আরও সবুজ, নিরাপদ এবং টেকসই পৃথিবী গড়ার পথ প্রশস্ত করছে, যা সকলের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।