শনিবার, 12 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

চাঁপাইনবাবগঞ্জের দেওপুরায় দুই দশক ধরে পরিত্যক্ত সরকারি খাদ্যগুদাম: সংকটে স্থানীয় কৃষকরা

খাদ্যশস্যের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে প্রায় দুই দশক ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে একটি সরকারি খাদ্যগুদাম। এরশাদ শাসনামলে নির্মিত এই গুদামটি ডাকাতির পর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে না পেরে চরম বিপাকে পড়েছেন।

শেয়ার করুন:
চাঁপাইনবাবগঞ্জের দেওপুরায় দুই দশক ধরে পরিত্যক্ত সরকারি খাদ্যগুদাম: সংকটে স্থানীয় কৃষকরা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল ও গোমস্তাপুর উপজেলা, যা দেশের অন্যতম প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে সুপরিচিত, সেখানে কৃষকদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি পরিত্যক্ত সরকারি খাদ্যগুদাম। প্রায় দুই দশক ধরে বন্ধ থাকা এই গুদামটি একসময় স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত ধান-চালসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্য সংরক্ষণ এবং সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। তবে একটি মর্মান্তিক ডাকাতির ঘটনার পর থেকে গুদামটির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজারো কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা তাদের জীবনযাত্রায় গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে গোমস্তাপুর উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নের দেওপুরায় প্রায় তিন একর জমির ওপর নির্মিত হয়েছিল এই সুবৃহৎ সরকারি খাদ্যগুদাম। কৃষকদের সুবিধার্থে এবং সরকারি খাদ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে সহজ করার লক্ষ্যেই এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। গুদামটির পাশেই কর্মকর্তাদের বসবাসের জন্য আধুনিক আবাসিক ভবনও তৈরি করা হয়েছিল, যা এই স্থাপনাকে একটি পূর্ণাঙ্গ খাদ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। একসময় এই গুদামকে কেন্দ্র করেই এলাকার খাদ্যশস্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হতো, যা স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

কিন্তু প্রায় দুই দশক আগে রাতের আঁধারে এই দেওপুরা খাদ্যগুদামে এক দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতরা গুদামে মজুত থাকা বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য লুট করে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর গুদামটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এর কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ প্রায় ২০টি বছর। এই সুদীর্ঘ সময়ে আর একবারও চালু হয়নি কৃষকদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এই সরকারি অবকাঠামোটি। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিশাল সম্পদ এখন অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে, যা শুধু সম্পদের অপচয়ই নয়, এলাকার কৃষকদের জন্যও এক বিরাট ক্ষতির কারণ।

স্থানীয় বাসিন্দা রাধা কান্তের কথায় উঠে আসে কৃষকদের দৈনন্দিন সংগ্রামের চিত্র। তিনি বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা বছরে অন্তত দুই মৌসুমে প্রচুর ধানসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যশস্য উৎপাদন করেন। এসব ফসল ফলাতে তাদের বিপুল অর্থ, শারীরিক শ্রম এবং মূল্যবান সময় ব্যয় করতে হয়। কিন্তু দেওপুরা খাদ্যগুদামটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় উৎপাদিত খাদ্যশস্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিক্রির সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। এই সুযোগ না থাকায় কৃষকরা প্রায়শই ফড়িয়া ও স্থানীয় আড়তদারদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন এবং বাধ্য হয়ে কম দামে তাদের কষ্টার্জিত ফসল বিক্রি করেন।

রাধা কান্ত আরও উল্লেখ করেন যে, গুদামটি চালু থাকলে কৃষকরা সরাসরি সরকারের কাছে তাদের উৎপাদিত খাদ্যশস্য বিক্রি করার সুযোগ পেতেন এবং এর মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যও নিশ্চিত হতো। বর্তমান পরিস্থিতিতে, গুদামটি বন্ধ থাকায় অনেক কৃষককে বাজার দরের চেয়ে অনেক কম দামে ফসল বিক্রি করতে হচ্ছে। এর ফলস্বরূপ, একদিকে যেমন কৃষকরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় তারা মারাত্মকভাবে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষক জাহাঙ্গীর আলমের মতো অনেকেই জানান, কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় তাদের জীবনমানের উন্নয়ন হচ্ছে না, বরং ফসল উৎপাদনের খরচও উঠছে না, যা তাদের দিশেহারা করে তুলেছে।

এলাকার উন্নয়ন এবং কৃষকদের বাঁচাতে দ্রুত গুদামটি চালুর জোর দাবি উঠেছে। কৃষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করে হলেও এই গুরুত্বপূর্ণ গুদামটি পুনরায় চালু করা হোক। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব মনিরুজ্জামান মনিরও এই দাবিতে সুর মিলিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতের তুলনায় বর্তমানে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই উন্নত হয়েছে, ফলে নিরাপত্তাজনিত কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা দেওপুরা খাদ্যগুদামটি পুনরায় চালু করতে এখন আর বড় কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকার কথা নয়।

মনিরুজ্জামান মনির আরও বলেন, দ্রুত প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে খাদ্যগুদামটি চালু করা হলে স্থানীয় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত খাদ্যশস্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিক্রির সুযোগ পাবেন। এতে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিও আরও গতিশীল হবে এবং এলাকার সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। তাই কৃষকের স্বার্থে দ্রুত দেওপুরা খাদ্যগুদামটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহন আহমেদ সরেজমিনে পরিদর্শন করে জানিয়েছেন যে, দেওপুরা খাদ্যগুদামটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলেও সামান্য সংস্কার ও প্রয়োজনীয় মেরামতকাজ সম্পন্ন করেই এটি পুনরায় চালু করা সম্ভব।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহন আহমেদ আরও নিশ্চিত করেন যে, গুদামটি চালুর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ইতিমধ্যেই অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে এটি চালুর চেষ্টা করা হবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা গুদামটি পুনরায় চালুর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। এই সমন্বিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘ দুই দশকের অচলাবস্থা কাটিয়ে দেওপুরা খাদ্যগুদামটি আবারও সচল হয়ে উঠবে এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাবে, যা এলাকার সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ