শনিবার, 12 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা

কুমিল্লার বাজারে বিদেশি ফলের দাম আকাশছোঁয়া, দেশি ফলেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ

কুমিল্লা মহানগরীর ফলের বাজারগুলোতে আমদানি করা ফলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, ফলে ক্রেতারা বাধ্য হচ্ছেন দেশি ফলের দিকে ঝুঁকতে। তবে বিদেশি ফলের চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশি ফলের ওপর চাপ বেড়েছে, যার ফলে স্থানীয় ফলের দামও কেজিতে ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন তারা।

শেয়ার করুন:
কুমিল্লার বাজারে বিদেশি ফলের দাম আকাশছোঁয়া, দেশি ফলেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ

কুমিল্লা মহানগরীর ফল বাজারগুলোতে বর্তমানে এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আমদানি করা বিদেশি ফলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা বাধ্য হচ্ছেন স্থানীয় ও তুলনামূলক কম দামের দেশি ফলের দিকে ঝুঁকতে। তবে এই পরিবর্তন শুধু বিদেশি ফলের মূল্যবৃদ্ধিকেই নির্দেশ করছে না, বরং দেশি ফলের ওপরও চাহিদার চাপ বাড়িয়ে তাদের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে কুমিল্লা মহানগরীর বিভিন্ন খুচরা ফলের বাজার ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে, যেখানে বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়ই বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।

বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আপেল, মাল্টা, আঙুর, আনার, নাশপাতি, কমলা, রামবুটান ও এভোকাডোর মতো বিদেশি ফলগুলো এখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। এক সপ্তাহ আগেও যে আপেল ২৯০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো, এখন তার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬০ থেকে ৩৮০ টাকা। সবুজ আপেল ৩৮০ টাকা এবং চায়না আপেল ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মাল্টার দাম কেজিতে ২০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ৩০০ থেকে ৩৬০ টাকায় পৌঁছেছে। কমলার দাম কেজিতে ৩০ টাকা বেড়ে ৩৮০ টাকা হয়েছে এবং নাশপাতির দামও কেজিতে ৩০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রামবুটান ও কাটলিচুর মতো বিদেশি ফলের দাম প্রতি কেজি ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং এভোকাডো ১ হাজার ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা এই ফলগুলোকে বিলাসী পণ্যে পরিণত করেছে।

বিদেশি ফলের এই চড়া দামের কারণে ক্রেতারা এখন তরমুজ, সাম্মাম, পেঁপে, ড্রাগন, পেয়ারা, আম, জাম্বুরা, বরই, আমড়া ও আখসহ বিভিন্ন দেশি ফলের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু বিদেশি ফলের ওপর চাপ কমলেও, দেশি ফলের চাহিদা আকস্মিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এবং চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় গত এক সপ্তাহে এসব ফলের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পাকা পেঁপে এক সপ্তাহ আগে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও, বর্তমানে তা ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় পৌঁছেছে। ড্রাগন ফলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে ২০০ থেকে ২২০ টাকা হয়েছে এবং পেয়ারার দাম ৩০ টাকা বেড়ে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাটিমন আমের দাম কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে ১৮০ টাকা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষকে দ্বিধায় ফেলেছে।

কুমিল্লা নগরীর ফল বিক্রেতারা এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং ক্রেতাদের অনীহায় চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন। কান্দিরপাড় এলাকার ফারুক এন্টারপ্রাইজের আব্দুল কাদের জানান, গত ১৫ বছর ধরে ফল বিক্রির অভিজ্ঞতা থাকলেও, বর্তমান সময়ের মতো এমন মন্দা তিনি কখনোই দেখেননি। তার মতে, ফলের দাম বেশি হলেও আগে বেচাবিক্রি ছিল, কিন্তু এখন দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও ক্রেতা নেই বললেই চলে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, গত দুই ঘণ্টায় এক কেজি ফলও বিক্রি করতে পারেননি। লাকসাম রোডের ফল বিক্রেতা মো. মনু মিয়াও একই কথা বলেছেন। তার ধারণা, মানুষের হাতে টাকা না থাকায় ফলের বিক্রি কমে গেছে, যা তাদের ব্যবসাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ক্রেতারাও বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আব্দুল হাই নামের এক ক্রেতা অভিযোগ করেন, ফলের বাজারে চরম অস্থিরতা চলছে এবং এক দোকান থেকে অন্য দোকানে একই ফলের দাম অন্তত ৩০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বেশি চাওয়া হচ্ছে। তিনি মনে করেন, বাজার মনিটরিংয়ের অভাবে এমনটি ঘটছে। জান্নাতুল মাওয়া নামের এক নারী ক্রেতা অসুস্থ সহকর্মীর জন্য ডালিম ও আপেল কিনতে এসে দামের অস্বাভাবিকতা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রোগীর জন্য এসব ফল উপকারী হলেও, বর্তমান দাম নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়ক্ষমতার সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছে। তিনি সরকারের কাছে এ বিষয়ে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।

ফল ব্যবসায়ীদের মতে, আমদানি করা ফলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। ডলারের বিনিময় হার এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে আমদানিকারকদের খরচ বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। অন্যদিকে, দেশি ফলের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধির কারণে স্থানীয় ফলের দামও বাড়ছে। এই দ্বিমুখী চাপ ফল বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই ভোগান্তিতে ফেলেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে, ফলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ফল সহজলভ্য করতে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বাজার তদারকি জোরদার করা, আমদানি নীতিতে পরিবর্তন আনা এবং দেশি ফল উৎপাদনে কৃষকদের সহায়তা বাড়ানো হলে এই সংকট কিছুটা হলেও মোকাবিলা করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। অন্যথায়, ফলের বাজার ঘিরে এই অস্থিরতা জনজীবনে আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ