শুক্রবার, 11 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা

খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে আস্থার সংকট: ভেজাল ও নকল পণ্যই বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো খাদ্যে ভেজাল ও নকল পণ্যের বিস্তার, যা ভোক্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। সম্প্রতি এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা এই ধারণাকেই সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং কার্যকর সমাধান চেয়েছেন।

শেয়ার করুন:
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে আস্থার সংকট: ভেজাল ও নকল পণ্যই বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের সবচেয়ে বড় এবং বিব্রতকর চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে খাদ্যে ভেজাল ও নকল পণ্যের বিস্তার। একইসঙ্গে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের পণ্য নকল করে বাজারজাতকরণ, আইনের অসৎ ব্যবহার এবং অতিরিক্ত মুনাফার লোভে খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার প্রবণতাও এই খাতের অগ্রগতির পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) ফুডপ্রো ইন্টারন্যাশনাল এক্সপোর ১১তম আসরে 'বাংলাদেশ ফুড ইন্ডাস্ট্রি: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ওয়ে ফরোয়ার্ড' শীর্ষক একটি কারিগরি অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন।

উক্ত অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. ইকবাল রউফ মামুন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে ভেজাল ও নকল খাবার একটি জঘন্য সমস্যা। তিনি উল্লেখ করেন, যখন কোনো কোম্পানির পণ্য বাজারে জনপ্রিয়তা লাভ করে, তখন দ্রুতই জিঞ্জিরা থেকে সেই পণ্যের নকল তৈরির তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। একই ধরনের মোড়ক ও নাম ব্যবহার করে মানহীন পণ্য তৈরির ঘটনা প্রায়শই দেখা যায়, যা প্রকৃত ও মানসম্মত পণ্য উৎপাদনকারীদের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়।

ড. মামুন আরও জানান, আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অসাধু চক্র একই ধরনের পণ্যের নামের বানানে সামান্য পরিবর্তন এনে লাইসেন্স সংগ্রহ করে। এর ফলে তারা বৈধভাবে নকল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করার সুযোগ পায়, যা একদিকে ভোক্তাদের প্রতারিত করে, অন্যদিকে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে এবং তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতিসাধন করে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, অতিরিক্ত মুনাফার লোভ খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ এবং দেশের মানুষের মধ্যে এখনো এই বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে, 'বাংলাদেশের খাবার মানেই ভেজাল'। এই নেতিবাচক ধারণাটিই খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, যা দূর করতে বহুমুখী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।

খাদ্য পরিদর্শন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ড. ইকবাল রউফ মামুন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে খাদ্য পরিদর্শনের নামে যতটা হয়রানি হয়, ততটা প্রকৃত পরিদর্শন হয় না। যেখানে সারা বিশ্বে ঝুঁকিভিত্তিক (রিস্ক-বেইজড) খাদ্য পরিদর্শন ব্যবস্থা চালু হয়েছে, সেখানে আমরা এখনো শেষ-পণ্যভিত্তিক (এন্ড-প্রোডাক্টভিত্তিক) পরিদর্শনে সীমাবদ্ধ রয়েছি। তিনি মনে করেন, কাউকে বিপদে ফেলা কখনোই কোনো সৎ উদ্দেশ্য হতে পারে না, বরং আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত খাদ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই আলোচনায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক মিস উজমা চৌধুরী যোগ দিয়ে বলেন, ফুড সিস্টেম ম্যানেজমেন্ট প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রে আলাদা হওয়ায় এর বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে সঠিক কারিগরি জ্ঞানের অভাবে এই চেষ্টা প্রায়শই অসমাপ্ত থেকে যায়।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম তার বক্তব্যে বাংলাদেশের ফুড সিস্টেম ম্যানেজমেন্টকে ঢেলে সাজানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং এই কাজে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, আধুনিক জীবনযাত্রার ব্যস্ততা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রক্রিয়াজাত খাবারের চাহিদা বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে এই খাতে আরও প্রবৃদ্ধি দেখা যাবে। তাই এই খাতকে উন্নত করার পাশাপাশি রপ্তানির বড় সুযোগও রয়েছে, যা সঠিকভাবে কাজে লাগানো উচিত।

শফিকুল ইসলাম খাদ্য খাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করার আহ্বান জানান। মোবাইল কোর্টের অভিযান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক সময় অভিযানের খবর যেভাবে প্রচার করা হয়, সেটি কাঙ্ক্ষিত নয়। তিনি নিজে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন উল্লেখ করে বলেন, ইউটিউবার বা কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে অভিযান প্রচার করা হলে অনেক ছোট বিষয়ও অতিরঞ্জিত হয়ে বড় আকার ধারণ করে, যা জনমনে ভুল বার্তা দিতে পারে।

তিনি আরও যোগ করেন, কোনো একটি স্থানে হয়তো সামান্য ময়লা পাওয়া গেল, আর আমরা সেই ময়লার পেছনে ছুটলাম। কিন্তু মূল বিষয় হলো আমি যে খাবার গ্রহণ করছি, সেটি নিরাপদ কিনা, তা নিশ্চিত করা। তিনি স্বীকার করেন যে, অনেকের বাসার খাবারের পরিবেশও হয়তো ভালো নয়। তিনি বলেন, মূল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আড়াল করতে চাই না, তবে অনেক সময় আমরা কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলছি। এই সমস্যার সমাধানে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে, তবে এককভাবে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এর সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য সকল স্টেকহোল্ডারের সম্মিলিত সহযোগিতা অপরিহার্য।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ