রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের পাইওনিয়ার বেইজে অবস্থিত একটি অস্থায়ী ভবনে গত সোমবার মধ্যরাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ ও সংবেদনশীল এই প্রকল্পের অভ্যন্তরে এমন একটি ঘটনা ঘটায় সর্বত্র উদ্বেগ ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত কীভাবে হলো এবং এর পেছনের কারণ কী, তা উদঘাটন করাই এখন মূল লক্ষ্য।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটের দিকে পাইওনিয়ার বেইজের একটি শ্রমিক আবাসন ভবনে আগুনের সূত্রপাত হয়। দ্রুতই আগুন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভবনের বেশ কিছু অংশ পুড়ে যায়। খবর পেয়ে ঈশ্বরদী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রাথমিকভাবে কোনো হতাহতের খবর না পাওয়া গেলেও, ভবনের আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
পাবনা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান হিসেবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটিতে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ প্রশাসন, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের একজন প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই কমিটি আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে করণীয় সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেবে।
দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক বিনিয়োগ। এর নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে এবং আশা করা হচ্ছে ২০২৫ সালের মধ্যে এর প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। এমন একটি মেগা প্রকল্পের অভ্যন্তরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রকল্পের মূল কাজ বা গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামাদির কোনো ক্ষতি হয়নি। এটি একটি অস্থায়ী শ্রমিক আবাসন ভবন ছিল এবং এর সাথে পারমাণবিক স্থাপনার সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই। তবে, প্রকল্পের সামগ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য ইতোমধ্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাবনার পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ উদঘাটনে পুলিশও তদন্ত কমিটির পাশাপাশি নিজস্ব তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নাশকতা বা অন্য কোনো ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যদিও প্রাথমিকভাবে এটি একটি দুর্ঘটনা বলেই মনে করা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে, তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেবে। এই প্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানের হওয়া উচিত এবং এ ধরনের ছোটখাটো ঘটনাও অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বড় ধরনের বিপদ এড়ানো যায়। শ্রমিকদের নিরাপদ আবাসন ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রকল্পের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি পুনঃমূল্যায়নের সুযোগ করে দিয়েছে। কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়ার আয়োজনও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
সরকার এবং প্রকল্প কর্তৃপক্ষ উভয়ই এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং স্বচ্ছতার সাথে তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অঙ্গীকার করেছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা হবে বলে জানানো হয়েছে। দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই প্রকল্পের নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ কার্যক্রম অপরিহার্য।