বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন। বেলা ১১টার দিকে জাদুঘরে পৌঁছালে তিনি প্রামাণ্যচিত্র দেখে গভীর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং অশ্রুসজল চোখে মন্তব্য করেন যে, ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্তি এবং গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার সম্ভব হলেও এর জন্য জাতিকে অনেক বড় মূল্য দিতে হয়েছে। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, এই শহীদ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের ঋণ রাষ্ট্র কখনোই শোধ করতে পারবে না এবং ভবিষ্যতে যেন আর এমন মর্মান্তিক ও নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ না ঘটে, সেই কামনা করেন।
রাষ্ট্রপতির এই গুরুত্বপূর্ণ সফরে তাঁর সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, প্রধানমন্ত্রীর পলিসি এবং স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালকসহ রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। এই উচ্চ পর্যায়ের উপস্থিতি রাষ্ট্রপতির এই পরিদর্শনের গভীর গুরুত্ব তুলে ধরে।
জাদুঘরে প্রবেশ করে রাষ্ট্রপতি প্রথমে দর্শনার্থী টিকিট সংগ্রহ করেন। এরপর তিনি 'লংওয়াক টু ডেমোক্রেসি' বা 'দীর্ঘ গণতান্ত্রিক যাত্রা' ওয়াকওয়ে ধরে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতন্ত্রের পথে দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ধাপের চিত্রাবলী গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। প্রায় ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে নির্মিত মেমোরিয়াল ও রেপ্লিকা আয়নাঘর ঘুরে দেখে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এই পরিদর্শনের এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনস্বরূপ জাদুঘর প্রাঙ্গণে একটি বৃক্ষরোপণ করেন, যা তাঁদের আত্মত্যাগের স্মরণে এক প্রতীকী বার্তা বহন করে।
পরিদর্শনের সময় রাষ্ট্রপতি বিশেষভাবে জাদুঘরের কয়েকটি সংবেদনশীল বিভাগ ঘুরে দেখেন, যার মধ্যে ছিল বিডিআর ম্যাসাকার, শাপলা ম্যাসাকার, নির্যাতন সামগ্রীর প্রদর্শনী এবং জোরপূর্বক গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের জন্য নিবেদিত সেকশনগুলো। শহীদদের ব্যক্তিগত চিঠি, স্মারক ও স্মৃতিচিহ্ন দেখে তিনি আবারও গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এই বস্তুগুলো যেন সেই সময়ের বেদনাদায়ক স্মৃতিগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছিল, যা রাষ্ট্রপতির চোখে জল এনে দেয়।
জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে জুলাই অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ এবং শিক্ষার্থী-জনতার অদম্য সংগ্রামের চিত্র ও দলিলপত্র প্রদর্শিত হচ্ছিল। রাষ্ট্রপতি প্রতিটি অংশ অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করেন। পরিদর্শনের চূড়ান্ত পর্যায়ে তিনি জুলাই জাদুঘরের মনসুন থিয়েটারে একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখেন, যা তাঁকে আরও একবার আবেগাপ্লুত করে তোলে। পরিদর্শন শেষে রাষ্ট্রপতি জাদুঘরের পরিদর্শন বইয়ে তাঁর অনুভূতি ও মন্তব্য লিপিবদ্ধ করেন, যা এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষ্য বহন করে।
পরিদর্শন বইয়ে দেওয়া বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উল্লেখ করেন যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ধারণ করে একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরতে এ ধরনের স্মৃতি সংরক্ষণ ও জাদুঘরের ভূমিকা অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের ইতিহাসকে জীবন্ত রাখে এবং নতুন প্রজন্মকে তার শিকড়ের সাথে সংযুক্ত করে।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। একই সাথে তিনি এই অভ্যুত্থানে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত সবার দ্রুত সুস্থতা এবং সার্বিক কল্যাণ কামনা করেন। তিনি শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আহতদের সাহস ও ত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। রাষ্ট্রপতি দৃঢ়ভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে চিরদিন স্মরণ করবে এবং তাদের আত্মদান দেশের গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।
এই পরিদর্শনের সময় রাষ্ট্রপতিকে জাদুঘরের বিভিন্ন স্থাপনা ও দলিলপত্রের বিষয়ে বিস্তারিত ব্রিফ করেন জুলাই জাদুঘরের গবেষণা দলের সদস্য জুবায়ের ইবনে কামাল ও ফারহান মাসুদ। এছাড়াও জুলাই জাদুঘর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি, আবরার ইলিয়াস এবং মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতির এই পরিদর্শন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং এর স্মৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।