প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক, বরেণ্য গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান আমীরুল ইসলাম আর নেই। কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে বুধবার রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার আকস্মিক প্রয়াণে দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে, যা দেশের বুদ্ধিজীবী মহল ও সাধারণ পাঠকদের মধ্যেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। প্রকাশক কাদের বাবু বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্টের মাধ্যমে আমীরুল ইসলামের মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেন, যা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন মহলে এবং শোকের বার্তা বয়ে আনে।
মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬২ বছর। জানা যায়, বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ সত্ত্বেও তার শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হয় এবং শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে হার মেনে তিনি চিরবিদায় নেন। তার চিকিৎসায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক দল সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছিলেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
১৯৬৪ সালের ৭ এপ্রিল ঢাকার লালবাগে জন্মগ্রহণ করেন আমীরুল ইসলাম। শৈশব থেকেই তিনি সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি গভীর অনুরাগ পোষণ করতেন। তার সাহিত্যিক জীবন শুরু হয়েছিল মূলত শিশুদের জন্য লেখালেখির মাধ্যমে, যেখানে তিনি নিজেকে একজন নিবেদিতপ্রাণ শিশুসাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। শিশুদের মনস্তত্ত্ব গভীরভাবে অনুধাবন করে তিনি তাদের জন্য অসংখ্য গল্প, ছড়া, কবিতা ও বিচিত্র ধরনের সৃজনশীল লেখা উপহার দিয়েছেন। শিশুসাহিত্যে তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৬ সালে তিনি দেশের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মাননাগুলোর অন্যতম ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন। এই পুরস্কার তার দীর্ঘদিনের সাহিত্যিক সাধনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আমীরুল ইসলামের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক, যার প্রতিটিই শিশুসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তার লেখায় শিশুদের জন্য হাসি, আনন্দ, কৌতূহল এবং নৈতিক শিক্ষার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটত। সহজ-সরল ভাষা, মনকাড়া বিষয়বস্তু এবং আকর্ষণীয় বর্ণনার মধ্য দিয়ে তিনি শিশুদের কল্পনার জগৎকে সমৃদ্ধ করতেন। তার লেখাগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিশুদের প্রিয় পাঠ্য হিসেবে সমাদৃত হয়েছে। শুধু বাংলা একাডেমি পুরস্কারই নয়, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করে তিনি তার সাহিত্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার সাহিত্যকর্ম বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের লেখকদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি গণমাধ্যম জগতেও আমীরুল ইসলামের পদচারণা ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল। দীর্ঘকাল ধরে তিনি সফলতার সঙ্গে গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘চ্যানেল আই’-এর অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তার নেতৃত্বে চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান বিভাগ অসংখ্য দর্শকপ্রিয় ও মানসম্মত অনুষ্ঠান উপহার দিয়েছে। সাহিত্য ও গণমাধ্যম, এই দুটি ভিন্ন ক্ষেত্রে তার সফল বিচরণ তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। তিনি তার সৃজনশীলতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন, যা তাকে এক সর্বজনীন শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত করেছিল।
আমীরুল ইসলামের প্রয়াণে দেশের সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক এবং তার অসংখ্য পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীর মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ হারালো একজন গুণী শিশুসাহিত্যিক, একজন দক্ষ গণমাধ্যম সংগঠক এবং একজন সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্বকে, যার অবদান দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে। তার সৃষ্টিশীল কর্ম এবং সমাজের প্রতি তার নিবেদিত অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিভিন্ন মহল থেকে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া হচ্ছে। দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা তার কর্মময় জীবনের স্মৃতিচারণ করছেন এবং তার শূন্যস্থান পূরণ হওয়া কঠিন বলে মনে করছেন।