প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, দেশের আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো জাতীয় নির্বাচনের মতোই অবাধ, সুষ্ঠু ও সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য হবে। তিনি এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের অবিচল প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী যারা যোগ্য বিবেচিত হবেন, শুধুমাত্র তারাই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবেন। সিইসি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, নির্বাচন কমিশন থেকে কোনো প্রকার বেআইনি নির্দেশনা দেওয়া হবে না, যা একটি নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে অপরিহার্য। এই মন্তব্য তিনি বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর রাজারবাগে অনুষ্ঠিত ‘নির্বাচনি দায়িত্ব পেশাদারত্বের সঙ্গে সম্পাদনের লক্ষ্যে পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের সামনে করেন।
সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীন তার বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনের প্রতিশ্রুতির কোনো ঘাটতি নেই বলে জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় পুলিশকে কোনো অযৌক্তিক বা বেআইনি আদেশ দেওয়া হবে না এবং এই বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ গ্যারান্টি দিতে পারেন। একইসাথে, পুলিশ বাহিনীও একটি সুন্দর ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছে। সিইসি উল্লেখ করেন, অতি দ্রুতই আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছি এবং এই প্রক্রিয়াতে পুলিশের সক্ষমতা ও পেশাদারিত্বের উপর অনেকাংশে নির্ভর করতে হয়। যেসব পুলিশ সদস্য ইতিপূর্বে নির্বাচন কেন্দ্রিক কার্যক্রমে প্রশিক্ষিত নন, তাদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার জন্য তিনি মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মহোদয়কে অনুরোধ করেছিলেন এবং প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যেই এই কার্যক্রম শুরু হওয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। বুধবারের এই অনুষ্ঠানটি ছিল সেই বৃহৎ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিরই উদ্বোধনী পর্ব।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নির্বাচন কমিশন উভয়েই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সিইসি বলেন, আমরা জাতীয় নির্বাচন যেভাবে অত্যন্ত সফলভাবে ও সুন্দরভাবে আয়োজন করতে পেরেছি, ঠিক একই মানদণ্ডে এবং একই গুণগত মানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনও সম্পন্ন করতে চাই। একটি বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য আমরা পুলিশের সক্রিয় সহযোগিতা চেয়েছি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহায়তা করার পূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সিইসি আরও যোগ করেন, নির্বাচন কমিশন হিসেবে যেমন আমাদের সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব রয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার, তেমনি পুলিশ বাহিনীরও আমাদের সহায়তা করা এবং একটি সুন্দর নির্বাচন আয়োজনে তাদের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই যৌথ প্রচেষ্টা ও অঙ্গীকারই একটি সফল নির্বাচনের ভিত্তি স্থাপন করবে।
জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে তারা একটি নিরপেক্ষ ও কার্যকর নির্বাচন আয়োজন করতে পারে। সিইসি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, পূর্বে নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা অনেকাংশে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। শুধু নির্বাচন কমিশনই নয়, সিভিল সার্ভিস থেকে শুরু করে পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিও মানুষের যে আস্থার অভাব ছিল, সেটিও পুনরুদ্ধার হয়েছে। তিনি বলেন, সব সরকারি সংস্থা, নির্বাচন কমিশন এবং আমাদের প্রশাসন প্রমাণ করেছে যে তারা তাদের দায়িত্ব সফলভাবে পালন করতে সক্ষম। একইভাবে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনও যেন একই মানদণ্ড ও গুণগত মানে অনুষ্ঠিত হতে পারে, সেদিকে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলে সিইসিকে ওয়াদা করেছেন। এই পুনরুত্থিত আস্থা আগামী নির্বাচনগুলোর জন্য এক ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
তবে, পুলিশ বাহিনীর কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও সিইসি উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, তাদের গাড়ির স্বল্পতা রয়েছে। নির্বাচনের সময় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের কারণে এই স্বল্পতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। গত বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সহিংসতায় তাদের অনেক গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বা পুড়ে গিয়েছিল, যার পূর্ণাঙ্গ প্রতিস্থাপন এখনও সম্ভব হয়নি। এই গাড়ি স্বল্পতার বিষয়টি তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে তুলে ধরেছেন। এছাড়াও, এবারের প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ২২ কোটি টাকা খরচ হবে, যা তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ তহবিল থেকেই ব্যয় করতে হবে। এটি তাদের জন্য বেশ কষ্টকর বলেও সিইসি জানান এবং এই খাতে কিছু অতিরিক্ত ফান্ডের জন্য তারা আবেদন করেছেন। এই আর্থিক ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন নিশ্চিত করা একটি বড় কাজ।
সিইসি আরও জানিয়েছেন যে, পর্যায়ক্রমে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং আনসার বাহিনীও তাদের নির্বাচন কেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সবাই মিলে একটি সুন্দর স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে সক্ষম হবেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি নতুন কিছু নয়। তিনি উল্লেখ করেন, 'আপনারা তো চব্বিশের আগস্টের পরের পরিস্থিতি দেখেছেন। জাতীয় নির্বাচনের সময় যে অবস্থা ছিল, সেই অবস্থার চেয়ে এখনকার অবস্থা খারাপ নয়; বরং আরও উন্নত হয়েছে।' তিনি তার পুলিশের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে বলেন, তারা যদি তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে বদ্ধপরিকর থাকেন, তবে তারা অবশ্যই সফল হবেন। আইজিপিও এই বিষয়ে তার সক্ষমতার কথা নিশ্চিত করেছেন।
সিইসি আরও জানান যে, অতীতে যারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেছেন, এবারও তারাই এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো পালন করবেন। এর মাধ্যমে অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং নির্বাচন পরিচালনায় পেশাদারিত্ব নিশ্চিত হবে বলে তিনি মনে করেন। এই ধারাবাহিকতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োগ একটি মসৃণ ও কার্যকর নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামগ্রিকভাবে, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট সকল বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টা ও অঙ্গীকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পথ সুগম করবে বলে সিইসি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।